মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের প্রায় ৯০ ভাগ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এ ভূরাজনৈতিক পালাবদলের ঠিক সমান্তরালে বাংলাদেশেও আসে পরিবর্তন। এর মধ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রাখাইনে মানবিক করিডোরের বিষয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। চলমান পরিস্থিতি ঘিরেই সম্প্রতি আবারো চাউর হয়েছে পুরনো গুঞ্জন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিয়ানমারে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ শুরু করতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কল্পিত এ প্রক্সি ওয়ারের সপক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ নেই। এর বাস্তবিক কোনো ভিত্তিও নেই। প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপস্থিতি একেবারেই কম, বিপরীতে গুঞ্জন বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ গুঞ্জনের পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। প্রথমত, আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্প্রতি ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও গোয়েন্দা পর্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাখাইন অঞ্চলে বাংলাদেশ দিয়ে একটি ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির বিষয় সামনে এসেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বল্পপরিচিতি বা অখ্যাত ওয়েব পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরেফিরে আসছে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ তত্ত্ব।
বিশেষ করে কিছু কূটনৈতিক ব্লগ, কথিত নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং প্রো-ন্যাশনালিস্ট চ্যানেল এ ধারণা প্রচার করছে যে–যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মাধ্যমে মিয়ানমারে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে, যাতে চীনের কৌশলগত করিডোর বাধাগ্রস্ত হয়। এ বর্ণনায় বাংলাদেশ, তুরস্ক, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোকেও জড়িয়ে একটি আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের চিত্র আঁকা হয়। লজিস্টিক ও কৌশলগত সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশও নাকি এর সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে—এমন দাবিও করা হয়েছে।
সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সীমান্তের পাশে একটি বা একাধিক ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ গঠনের পথ খুলে দিতে চায়, যেন তারা চীনের ইউনান থেকে কিয়াউকপিউ পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এ বিষয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতি সম্পর্ক বিষয়ক থিংকট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে এসব গুঞ্জনের সবগুলোই অতিশয় কল্পনাপ্রসূত ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ধরনের ভুতুড়ে দাবি বা গুঞ্জনগুলো এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে বড় পরিসরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি বলেই ডালপালা বেড়েছে। ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা বেশকিছু দাবির বিপরীতে সঠিক তথ্য তুলে ধরলেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এসব তত্ত্ব খুব একটা স্থান পায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার নীতির পেছনে চীনকে প্রতিহত করার মতো কিছু কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকলেও লোয়ি ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এ ধরনের জটিল অঞ্চলিক সামরিক হস্তক্ষেপ বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। সামরিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি এতটাই জটিল যে, এমন কোনো অভিযান গোপনে করা গেলে তা বেশিদিন গোপনও রাখা প্রায় অসম্ভব।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের বিরোধী গোষ্ঠীকে কিছুটা সমর্থন দিয়েছে। তবে তা শুধু মানবিক সহায়তার ও ‘প্রাণঘাতী নয়’ এমন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরে সামরিক অস্ত্র বা রসদ সরবরাহের প্রমাণ নেই।
গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু সেলথের মতে, ‘মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরেই অবাধ তথ্যপ্রবাহের অভাব রয়েছে। যে কারণে সবসময়ই গোপন সংযোগ ও গুজবের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত হয়েছে। কিছু খবরভিত্তিক ব্লগ ও কথিত গণমাধ্যমের খবর, প্রকৃত তথ্যের অভাব এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির প্রতিযোগিতা গুজবের পেছনে জ্বালানির কাজ করছে। আর এ গুজবকে শক্তিশালী করতে চাইছে এমন একটি পক্ষ, যারা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে অঞ্চলকে আরো জটিল করে তুলতে চায়।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নিজস্ব নীতিগত দ্বন্দ্ব—বিশেষ করে ‘বিদেশী যুদ্ধ এড়িয়ে চলা’ নীতির কারণে—যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে, এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, মিয়ানমারে যে সংকট চলছে তার মূল কেন্দ্রে রয়েছে সেনাশাসিত জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে জড়িত বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী।
তাদের বিশ্লেষণ বলছে, মিয়ানমার সংকট মোকাবেলায় পশ্চিমা দেশগুলো মূলত অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালাচ্ছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে অকার্যকরতা দেখা গেছে, যা মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।


