চলমান আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি থেকে ষষ্ঠ কিস্তি মুক্তির আগে আবারও ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধি দল। দলটি ২৯ অক্টোবর ঢাকায় পৌঁছাবে এবং দুই সপ্তাহের জন্য দেশে থাকবে। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো চলতি ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলী এবং পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।
আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও নেতৃত্বে দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে। দলের পর্যালোচনা প্রধানত পঞ্চম কিস্তির অর্থছাড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত শর্ত পূরণের অগ্রগতি নিয়ে হবে।
বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুমোদিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদিত হয়েছিল। এরপর প্রথম কিস্তি ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার (ফেব্রুয়ারি ২০২৩), দ্বিতীয় কিস্তি ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার (ডিসেম্বর ২০২৩), তৃতীয় কিস্তি ১১৫ কোটি ডলার (জুন ২০২৪), এবং চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি ১৩৩ কোটি ডলার (জুন ২০২৫) এসেছে।
প্রাথমিকভাবে সাত কিস্তিতে ৪৭০ কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে কিস্তির সংখ্যা বেড়ে ৮টি এবং ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলার হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই মোট ৩৬৪ কোটি ডলার বিতরণ হয়েছে, বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার, যা সর্বশেষ সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিতরণ হবে।
আইএমএফের দল এবারে বিশেষভাবে ‘পরিমাণগত কর্মক্ষমতা মানদণ্ড’ (কিউপিসি) পূরণ নিয়ে আলোচনা করবে। কিউপিসি হলো আইএমএফের বাধ্যতামূলক শর্ত। মে মাসে নতুন কিউপিসি শর্তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিদেশি ঋণ নেওয়ার সীমা, জ্বালানি ও সার আমদানির বকেয়া পরিশোধ এবং এনবিআরের রাজস্ব আদায়। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণের শর্তও রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ না হলে পরবর্তী কিস্তি প্রদান করা হবে না। তবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ চাইলে শর্তের ক্ষেত্রে পূর্ণ বা আংশিক অব্যাহতি দিতে পারে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮৪৪ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ নিতে পারবে না।
তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) শর্ত অনুযায়ী থাকা উচিত ছিল ১,৭৪০ কোটি ডলার, যা বাস্তবে ২,০৭৩ কোটি ডলার। জ্বালানি ও সার আমদানির বকেয়া পরিশোধ শর্তও পূরণ হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। জুন পর্যন্ত শর্ত অনুযায়ী ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যার বিপরীতে এনবিআর ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা আদায় করেছে।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, আগামী বৈঠকে এই রাজস্ব আয়ের ঘাটতি এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ নিয়ে আলোচনা হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা না পূরণ হলে আইএমএফের পূর্ণ অব্যাহতি পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া মুদ্রা বিনিময় হারের প্রক্রিয়া ও ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালাও আলোচনার বিষয় হবে।
বর্তমানে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি থেকে বাংলাদেশ ৪৩ কোটি ডলার করে পাবেন। শেষ কিস্তি ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছাড়া অন্যান্য শর্ত পূরণে কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, “কিস্তি গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের বাস্তবায়ন আগে জরুরি।”
এই সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চলমান আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইএমএফ দল কীভাবে রাজস্ব আদায় ও অন্যান্য শর্ত পূরণের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবে, তা দেশের ঋণ প্রবাহ ও অর্থনৈতিক নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।


