ধনীকে লুট করে গরীবকে বিলিয়ে দেওয়া নীতিতে বিশ্বাসী রবিন হুড এবং তার আনন্দময় সঙ্গীদল ইংরেজি জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক স্থায়ী অংশ ।ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট-এর রাজত্বকালে নির্মিত এই দুঃসাহসিক উপাখ্যানে, রবিন হুডকে দেখা যায় সুন্দরী মেইড মারিয়ানকে জয় করতে এবং নটিংহামের শেরিফের দুষ্ট পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গল্প প্রচলিত হলেও, এর সবচেয়ে পরিচিত উপাদানগুলো আসলে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সংযোজন।
শারউড বনের শিকড়ের মতোই রবিন হুডের গল্পের উৎসও ইংরেজ ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। তার নাম ছড়িয়ে আছে ডার্বিশায়ারের রবিন হুডের গুহা ও স্তম্ভ, ইয়র্কশায়ারের বার্নসডেল বনে রবিন হুডের কূপ এবং রবিন হুডের উপসাগরে। তবে চতুর্দশ শতাব্দীতে ফিরে গেলে রবিন হুড আজকের সবুজ পোশাক পরা, তীর-ধনুক হাতে পরিচিত নায়কের চেয়ে ভিন্নরূপে দেখা দেন। ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও সমাজের বিবর্তনের সাথে সাথে রবিন হুডও ক্রমে নতুন চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করে কিংবদন্তীতে পরিণত হন।
১৯শ শতাব্দীতে স্যার ওয়াল্টার স্কটের আইভানহো (১৮২০) প্রকাশের পর রবিন হুডের প্রতি নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। স্কট তাকে “আইনশৃঙ্খলাহীনদের রাজা ও ভালো মানুষের রাজপুত্র” হিসেবে চিত্রিত করেন, যিনি অনুপস্থিত রাজা রিচার্ডের প্রতি অনুগত। এরপর ঐতিহাসিক জোসেফ হান্টার নথি ঘেঁটে আবিষ্কার করেন মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে অসংখ্য রবিন হুড নামক ব্যক্তি ছিলেন। প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১২২৬ সালের ইয়র্কশায়ারের আদালতের একটি নথিতে, যেখানে রবিন হুডকে পলাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও ভিন্ন ভিন্ন রবিন হুডের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর ফলে ধারণা হয় যে কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন, বরং “রবিন হুড” নামটি সময়ে সময়ে আইনভঙ্গকারীদের এক ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
যখন নথিপত্র নির্দিষ্ট পরিচয় দেয়নি, তখন পণ্ডিতরা নজর দেন লোককাহিনী, কবিতা ও ব্যালাডের দিকে। উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ডের দ্য ভিশন অফ পিয়ের্স প্লোম্যান (১৪শ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ) এ প্রথম রবিন হুডের কবিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায় একজন অশিক্ষিত যাজক ল্যাটিন না জানলেও রবিন হুডের ছন্দ জানে। এটি প্রমাণ করে যে রবিন হুড তখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিলেন। প্রথমদিকের ব্যালাডে রবিন হুডের পটভূমি ছিল বার্নসডেল বন, পরে তা শারউড বনের সাথে যুক্ত হয়। নরম্যান বিজয়ের পর (১০৬৬) বন আইন কঠোর হওয়ায় স্থানীয়দের শিকার ও কাঠ সংগ্রহ নিষিদ্ধ হয়। এ কারণে বনাঞ্চল বিদ্রোহী ও আইনভঙ্গকারীদের লুকানোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
১৫শ শতাব্দীতে রবিন হুড বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রাচীনতম ব্যালাড রবিন হুড অ্যান্ড দ্য মঙ্ক-এ দেখা যায় রবিন নটিংহামে ধরা পড়ে, কিন্তু তার সঙ্গীরা সহিংসতায় প্রতিশোধ নেয়। মধ্যযুগে শাস্তি ছিল নিষ্ঠুর, কিন্তু এই ব্যালাডগুলোতে নিম্নশ্রেণী ধূর্ততা ও সহিংসতার মাধ্যমে উচ্চশ্রেণীকে শাস্তি দিতে সক্ষম হয়।
একই সময়ে এ জেস্ট অফ রবিন হুড দীর্ঘতম ব্যালাড হিসেবে জন্ম নেয়। এখানেই প্রথমবার ধনী থেকে চুরি করে গরীবকে দেওয়ার নীতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। রবিন এখানে একজন সাধারণ স্বাধীন ভূস্বামী, না কৃষক, না নাইট যিনি রাজদরবার ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান। তবে এই গল্পগুলোতে রক্তাক্ত প্রতিশোধও ছিল প্রবল। রবিন হুড অ্যান্ড গাই অফ গিসবর্ন-এ রবিন তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করে মৃতদেহ বিকৃত করে, যা তার চরিত্রে এক ভয়ংকর দিকও প্রকাশ করে।
১৬শ শতাব্দীতে রবিন হুড তার বিপজ্জনক ধার কিছুটা হারিয়ে মে দিবস উৎসবের অংশ হয়ে ওঠেন। ইংরেজরা বসন্তকে স্বাগত জানাতে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও আনন্দোৎসবে রবিন হুড ও তার সঙ্গীদের পোশাক পরত। এমনকি রাজপরিবারও এতে অংশ নিত। ১৫১৬ সালে রাজা অষ্টম হেনরি ও রানী ক্যাথরিন ২০০ জন সবুজ পোশাক পরা দলের সাথে এই উৎসবে যোগ দেন।
এই সময়ে মেইড মারিয়ান ও ফ্রাইয়ার টাক কিংবদন্তীতে প্রবেশ করেন। তারা প্রথমে মে দিবস উৎসবের চরিত্র হলেও ধীরে ধীরে রবিন হুডের গল্পে স্থায়ী অংশে পরিণত হন। এলিজাবেথীয় যুগে রবিন হুড নাট্য মঞ্চেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
শতাব্দী জুড়ে লেখকরা রবিন হুডকে নতুনভাবে রূপ দেন। ওয়াল্টার স্কট তাকে পুনর্গঠন করেন, আর ১৮৮৩ সালে হাওয়ার্ড পাইল শিশুদের জন্য দ্য মেরি অ্যাডভেঞ্চারস অফ রবিন হুড প্রকাশ করে কিংবদন্তীকে নতুন মাত্রা দেন। পাইলের বই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও রবিন হুডকে জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর ১৯১৭ সালে পল ক্রেসউইক ও এন.সি. ওয়াইথ একসাথে চিত্রিত রঙিন রবিন হুড উপস্থাপন করেন, এটা ভিজ্যুয়াল দিক থেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্করণগুলোর একটি।
২০শ শতাব্দীর শুরুতেই রবিন হুড বই থেকে সিনেমায় প্রবেশ করেন। সিনেমা, টেলিভিশন ও আধুনিক সাহিত্য রবিন হুডকে চিরন্তন করে তুলেছে। সম্ভবত রবিন হুডের কিংবদন্তী এত শতাব্দী ধরে টিকে আছে কারণ তিনি কেবল এক আইনভঙ্গকারী ডাকাত নন, বরং ন্যায়বিচার, প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। শাসক শ্রেণীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এই চরিত্রের মধ্যে মানুষ যুগে যুগে নিজেদের মুক্তির প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছে।


