নেক্রোম্যান্সি (Necromancy) শব্দটি শুনলেই শিহরণ জাগে। মৃতদের আত্মাকে জাগিয়ে তুলে ভবিষ্যৎ জানা, গোপন তথ্য উদ্ধার বা ক্ষমতা অর্জনের চর্চাকে বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। যদিও এটি একটি অতিপ্রাকৃত চর্চা হিসেবে বিবেচিত, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানের গহীনে নেক্রোম্যান্সির অস্তিত্ব এক রহস্যময় আলো ছড়ায়। প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক ওকাল্ট আন্দোলন পর্যন্ত এই চর্চার ধরণ, ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য সময়ে সময়ে বদলেছে, কিন্তু এর মূলে রয়েছে মানুষের এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন!
নেক্রোম্যান্সির উৎপত্তি ঘটেছে মূলত প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেই। ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, গ্রিক এবং রোমান সমাজে মৃতদের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের নানা রকম প্রথা প্রচলিত ছিল। হোমারের Odyssey-তে ওডিসিয়াসের নেক্রোম্যান্টিক রীতি বর্ণিত হয়েছে যেখানে তিনি মৃত আত্মাদের ডেকে আনে ভবিষ্যৎ জানার জন্য। প্রাচীন গ্রিসে এমনকি ‘নেক্রোম্যান্টিয়ন’ নামে মন্দিরও ছিল যেখানে মৃতদের আত্মার ডাক পড়ত।
রোমান লেখক ও ইতিহাসবিদ প্লিনি দ্য এল্ডার তার Natural History-তে উল্লেখ করেছেন, অনেক যাজক ও গোপন সাধক নেক্রোম্যান্সি চর্চা করতেন। মধ্যযুগে এটি জাদুবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে বিবেচিত হত এবং খ্রিস্টীয় ধর্মের দৃষ্টিতে তা পাপ ও শয়তানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
নেক্রোম্যান্সি বিভিন্ন ধর্মে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মৃতের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো বৈধতা নেই; বরং জিন-সংক্রান্ত প্রতারণার সাথে নেক্রোম্যান্সিকে তুলনা করা হয়। খ্রিস্টধর্মে এটি ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ বা শয়তানের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বাইবেলে স্পষ্টভাবে ‘উইচ অব এন্ডোর’ এর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে রাজা শাউল মৃত নবী স্যামুয়েলের আত্মাকে ডেকে আনার চেষ্টা করেন। তাওরাতে (ইহুদি ধর্মগ্রন্থ) নেক্রোম্যান্সি নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় হিসেবে চিহ্নিত।
তবে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মে আত্মা ও পুনর্জন্মের ধারণা থাকায় আত্মার অস্তিত্ব একটি গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা হলেও, মৃত আত্মার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের রীতিকে অশুভ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অনেক নৃতাত্ত্বিক গবেষক মনে করেন নেক্রোম্যান্সি একটি বিভ্রান্তিকর শব্দ, অনেক আদিবাসী সংস্কৃতিতে এটি আসলে পূর্বপুরুষ পূজা বা ‘অ্যানসেস্টর কাল্ট’-এর রূপ। আফ্রিকার ইবো জাতিগোষ্ঠীতে মৃতদের আত্মা পরিবারের নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়। চীনা টাওয়িস্ট সংস্কৃতিতে ‘Ghost Marriage’ বা মৃতদের বিয়ের মতো রীতিতেও মৃতদের সাথে আত্মিক সম্পর্ক একটি সামাজিক রূপ লাভ করেছে।
বাংলা সমাজেও ‘ভূতের পুজো’, ‘শ্মশানতন্ত্র’, বা ‘পিতৃপুরুষের তর্পণ’ অনেকটা নেক্রোম্যান্সির সামাজিক সংস্করণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও এসব রীতিতে জাগতিক ভবিষ্যৎ জানা নয় বরং আত্মার শান্তি কামনাই মুখ্য উদ্দেশ্য।
১৩শ থেকে ১৭শ শতক পর্যন্ত ইউরোপে নেক্রোম্যান্সি ছিল নিষিদ্ধ এবং বিপজ্জনক একটি চর্চা। অনেককে ডাইনিবিদ্যা বা ‘উইচক্রাফট’-এর অভিযোগে হত্যা করা হয়। কিন্তু একই সময়ে আলকেমি, হ্যারমেটিকিজম, এবং কাব্বালাহের মতো গোপন দর্শনের অনুসারীরা এই চর্চার মধ্যে উচ্চতর জ্ঞান খুঁজতে শুরু করে। ১৮শ শতকে এলিফাস লেভি, ম্যাডাম ব্লাভাতস্কি ও পরবর্তীকালে অ্যালেস্টার ক্রাউলি’র মতো ওকাল্ট চিন্তাবিদরা নেক্রোম্যান্সিকে আত্মা ও চেতনাজগতের সঙ্গে এক ধরণের দর্শনীয় সংলাপ হিসেবে বিবেচনা করেন।
আজকের আধুনিক যুগে নেক্রোম্যান্সি একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। হরর সিনেমা, ভিডিও গেম, সাহিত্য, এমনকি টেলিভিশনের ডকুমেন্টারিতেও “স্পিরিট বোর্ড”, “সেশন”, “মিডিয়াম” ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে মৃতদের ডাকার চেষ্টা প্রদর্শিত হয়। সাইকিক মিডিয়ামরা দাবি করেন তারা আত্মার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ১৯শ শতকের ‘Spiritualism’ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র আমেরিকা ও ইউরোপ, এটিকে জনপ্রিয় করে তোলে।
তবে বিজ্ঞান এসব দাবিকে যুক্তিহীন ও মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি হিসেবে বিবেচনা করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শোকের সময় মানুষের মন এমন বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে যেখানে সে মনে করে মৃত স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।
নেক্রোম্যান্সিকে শুধুই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি মানুষের এক গভীর অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস, মৃত্যুর পর কী আছে? আত্মা কি থাকে? স্মৃতি কি চেতনায় রয়ে যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই নেক্রোম্যান্সি এক প্রকার প্রতীকী অনুশীলন হয়ে উঠেছে। এটি জীবিত ও মৃতের সীমারেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
জাঁ-পল সার্ত্র, এমিল চোরান কিংবা হাইডেগারের মতো অস্তিত্ববাদীরা জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই ফাঁককেই অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখেছেন। এক অর্থে নেক্রোম্যান্সি সেই সংকটকে ছুঁতে চাওয়ার মানসিক আকাঙ্ক্ষা।
নেক্রোম্যান্সি শুধুমাত্র এক অতিপ্রাকৃত চর্চাই নয়, এটি মানব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্য দিয়ে মানুষ মৃত্যুর সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্য বাস্তবতা, এক অন্তর্জগতে প্রবেশের চেষ্টা করে। প্রাচীনকালে এটি ছিল ভবিষ্যৎ জানার হাতিয়ার, ধর্মে এটি পাপ, আর আধুনিক যুগে এটি জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।


