মহাবিশ্ব আসলে কি দিয়ে তৈরি ?

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি ও গঠন সম্পর্কে মানুষের অনুসন্ধান হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা “Cosmos” শব্দ ব্যবহার করে এই মহাশূন্যের সুশৃঙ্খল রূপ বর্ণনা করলেও, আধুনিক পদার্থবিদ্যার আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত আমাদের উপলব্ধি সীমিত ছিল দৃশ্যমান তারামণ্ডলী, গ্রহ-নক্ষত্র আর নিকটবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেই।২০শতকের গোড়ার দিকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও হাবলের প্রসারণমূলক মহাবিশ্বের আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা প্রথম উপলব্ধি করি মহাবিশ্ব একটি গতিশীল, প্রসারমান সত্তা, যেখানে গ্যালাক্সিগুলো ক্রমাগত একে অপর থেকে সরে যাচ্ছে।

তবে এসব পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক মডেল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি গভীর সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থ যেগুলো আমরা তারা, গ্রহ, ধূলিকণা ও গ্যাস আকারে দেখি সেগুলো গ্যালাক্সিগুলোর গঠন, গতি ও বৃহৎ কাঠামোগত ধরণ বোঝাতে কসমিক স্কেলে পর্যাপ্ত নয়। আমাদের চেনা জগৎ আসলে মহাবিশ্বের ৫% ক্ষুদ্রাংশ মাত্র। বাকি ৯৫%-এরও বেশি জুড়ে রয়েছে দুইটি রহস্যময় উপাদান—ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। ডার্ক ম্যাটার ধারণাটি ১৯৩০-এর দশকে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ থেকে উৎপত্তি লাভ করে। যেখানে দেখা যায় দৃশ্যমান ভর দিয়ে পর্যাপ্ত মহাকর্ষীয় বল ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এর কয়েক দশক পর ১৯৯৮ সালে সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়—মহাবিশ্বের প্রসারণ হার বাড়ছে, অর্থাৎ এক রহস্যময় শক্তি (ডার্ক এনার্জি) মহাকর্ষীয় আকর্ষণকে পরাস্ত করছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়— এই অদৃশ্য উপাদানগুলো আসলে কী? তারা কীভাবে মহাবিশ্বের গঠন, বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে? বিজ্ঞান এ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে এগিয়েছে এবং কোথায় রয়েছে মূল চ্যালেঞ্জ? ১৯২০-এর দশকে এডউইন হাবল আবিষ্কার করেন, আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের বাইরেও অসংখ্য ছায়াপথ রয়েছে। এরপর বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন গ্যালাক্সিগুলোর গতি ও মহাবিশ্বের প্রসারণের ধরন কেবল দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

১৯৩৩ সালে সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিটজ জুইকি কমা ক্লাস্টারের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে প্রথম ডার্ক ম্যাটার-এর ধারণা দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ বলেছিল গ্যালাক্সিগুলোর এত বেশি গতিবেগ থাকা সত্ত্বেও ক্লাস্টারটি ভেঙে পড়ছে না, নিশ্চয়ই এখানে দৃশ্যমান বস্তু ছাড়াও আরও কিছু আছে যা মহাকর্ষ বল তৈরি করছে। ডার্ক ম্যাটার এমন এক পদার্থ, যা আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে না। ফলে এটি সরাসরি দেখা যায় না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, মহাবিশ্বের প্রায় ২৭% ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রমাণ দেয়।

যেমন- গ্যালাক্সিগুলোর বাইরের অংশগুলো এমন গতিতে ঘুরছে যা দৃশ্যমান বস্তু দিয়ে সম্ভব নয়। সেখানে অতিরিক্ত অদৃশ্য ভর থাকতে হবে। ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি এমনকি দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলোও বাঁকিয়ে দেয়। মহাবিশ্বের আদিম বিকিরণ বিশ্লেষণ করেও ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি নির্ধারণ করা যায়। আজও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি। সম্ভাব্য কণাগুলো হল, WIMPs (Weakly Interacting Massive Particles), Axions, Sterile Neutrinos ইত্যাদি। তবে ২০২৩ সালে XENONnT ডিটেক্টর এবং ২০২৪ সালের LUX-ZEPLIN (LZ) প্রকল্প থেকে কিছু সম্ভাব্য সংকেত পাওয়া গেছে, যা WIMP কণার অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়, যদিও তা নিশ্চিত নয়।

১৯৯৮ সালে দুটি গবেষক দল পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, মহাবিশ্বের প্রসারণ শুধু অব্যাহত নয় বরং দ্রুততর হচ্ছে। এ বিস্ময়কর ফলাফল ব্যাখ্যা করতে তারা ধারণা দেন ডার্ক এনার্জি–র। ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের ৬৮% অংশ জুড়ে আছে এবং এটি এমন এক রহস্যময় শক্তি, যা মহাকর্ষকে পরাস্ত করে গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপর থেকে দ্রুত দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞান অনুসারে ডার্ক এনার্জির কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে: Einstein’s Cosmological Constant — স্থানকাল নিজেই একটি শক্তির উৎস হতে পারে।Quintessence Theory — ডার্ক এনার্জি হতে পারে সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল একটি ক্ষেত্র।

Modified Gravity Theories — মহাকর্ষের বর্তমান মডেলই অসম্পূর্ণ হতে পারে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা Euclid Space Telescope উৎক্ষেপণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো—ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের প্রসারণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করা। বাংলাদেশে যদিও সরাসরি ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণা সীমিত, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কসমোলজি, থিওরেটিকাল ফিজিক্স ও নিউট্রিনো ফিজিক্সে গবেষণা হচ্ছে। ২০২৩ সালে International Centre for Theoretical Physics (ICTP) এর সাথে বাংলাদেশের কিছু গবেষক কসমিক রে এবং মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো নিয়ে যৌথ গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন। ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এগুলো আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রতীকও বটে।

আমরা কি এমন এক মহাবিশ্বে বাস করছি, যেখানে দৃশ্যমান সত্য আসলে সামান্য? আমাদের চেতনা কি শুধু ৫% বাস্তবতার মধ্যেই বন্দি? নাকি ডার্ক ম্যাটার-এনার্জি–র প্রকৃতি বুঝতে পারলে আমরা মহাকাল, টাইম ট্র্যাভেল বা মাল্টিভার্স সম্পর্কেও নতুন দরজা খুলব? দার্শনিক এমিল সিওরান বলেছিলেন—“The universe is not only stranger than we imagine; it is stranger than we can imagine.” ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি যেন এ কথার বাস্তব দৃষ্টান্ত। আমরা যা দেখি, তা মহাবিশ্ব নামের সুবিশাল বরফখণ্ডের কেবল মাথা। যাত্রা শুরু হয়েছে মূল দেহের সন্ধানে। ভবিষ্যতের উন্নত প্রযুক্তি হয়তো একদিন আমাদের জানাবে—ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি আসলে কী, আর আমাদের স্থান এই অসীম মহাবিশ্বে কোথায়।

কিছু প্রশ্ন থেকে যাক, যদি আমরা ৯৫% অদৃশ্য মহাবিশ্ব বুঝতে পারি, তবে কি আমাদের বাস্তবতা ও অস্তিত্বের সংজ্ঞাও পাল্টে যাবে? মহাবিশ্বের অদৃশ্য উপাদান কি আমাদের চেতনারও অদৃশ্য স্তরকে স্পর্শ করে? আমরা কি মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ জানার খুব কাছাকাছি নাকি চিরকাল অপূর্ণতার মধ্যেই থাকব?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন