মহাবিশ্বের শেষ কিভাবে ? প্রশ্নটি এক অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে

কসমোলজিস্ট কেটি ম্যাক ব্যাখ্যা করছেন – এক বছর আগে যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করত, মহাবিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাব্য শেষ পরিণতি কী হতে পারে, আমি নির্দ্বিধায় উত্তর দিতে পারতাম। কসমোলজিস্ট হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে মহাবিশ্বের শেষ নিয়ে ভাবছি – এমনকি এ বিষয়ে একটি বইও লিখেছি।
আমরা জানি, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং সেই সম্প্রসারণের গতি বাড়ছে। বহু দূর ভবিষ্যতে, এই দ্রুততর সম্প্রসারণ মহাবিশ্বকে এতটাই খালি করে ফেলবে যে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। নক্ষত্রগুলো নিভে যাবে, পদার্থগুলো ক্ষয়ে যাবে, ব্ল্যাক হোলগুলোও শেষ পর্যন্ত বাষ্পীভূত হবে, আর কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ফোটন থেকে যাবে, যা ধীরে ধীরে সমস্ত সৃষ্টির অবশিষ্ট তাপ ছড়িয়ে দেবে।

এই দৃশ্যপটকে “হিট ডেথ” বা “বিগ ফ্রিজ” বলা হয়। আমাদের মহাবিশ্বের আচরণের বর্তমান সেরা মডেল অনুসারে, এটাই ছিল সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি।কিন্তু এখন যদি আমাকে একই প্রশ্ন করা হয়, আমি একটু থেমে ভাবতাম। গত মার্চে প্রকাশিত ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কপিক ইন্সট্রুমেন্ট (DESI)-এর ফলাফল, যা আগের বছরের ডেটার উপর ভিত্তি করে তৈরি, আমাদের মহাবিশ্বের একটি ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে। এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় উপাদান – ডার্ক এনার্জি – সম্পর্কে আমাদের পূর্বানুমানকে চ্যালেঞ্জ করছে।

ডার্ক এনার্জি
ডার্ক এনার্জি আবিষ্কার এক বিশাল চমক ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, যা বিগ ব্যাং দ্বারা শুরু হয়েছিল, তা গত কয়েক বিলিয়ন বছরে আস্তে আস্তে দ্রুততর হচ্ছে। এই ত্বরিত সম্প্রসারণ তথ্য থেকে পরিষ্কার ছিল এবং বিভিন্ন গবেষণা দল একে নিশ্চিত করেছিল, তবে এটা কোনোভাবেই বোধগম্য ছিল না। সাধারণ ধারণা ছিল, মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু – গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা, এমনকি শক্তিও – একে অপরের ওপর মাধ্যাকর্ষণ বল প্রয়োগ করে, যা সম্প্রসারণের গতিকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়। তবে যদি সম্প্রসারণ দ্রুততর হয়, তাহলে মনে হয়, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি ভেতর থেকে স্থানকে প্রসারিত করছে।

আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়। তিনি তাঁর সমীকরণে “কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট” নামে একটি পদ যোগ করেছিলেন, যা স্থান-কালকেই প্রসারণশীল করে তুলতে পারে। যদিও পরে তিনি একে ভুল বলে মনে করে বাদ দেন, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আবিষ্কারের পর ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, হয়তো এই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টই স্থানকে প্রসারণ করছে। বিশেষ করে, যখন মহাবিশ্ব ঘন ছিল, মাধ্যাকর্ষণ সম্প্রসারণ কমিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ছয় বিলিয়ন বছর আগে যখন মহাবিশ্ব যথেষ্ট বড় ও হালকা হয়ে যায়, তখন এই প্রসারণের প্রভাব আবার আধিপত্য বিস্তার করে।

গত কয়েক দশক ধরে, এই মডেলের সাথে আমাদের পর্যবেক্ষণগুলি মোটামুটি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। তাই পদার্থবিজ্ঞানীরা কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টকে মডেলে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিলেন। ডার্ক এনার্জি বলতে এখন মূলত কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা এর থেকেও অদ্ভুত কোনো কিছুকে বোঝানো হয়।
কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট নাকি অন্য কিছু?
ডার্ক এনার্জির সংজ্ঞা খুলে রেখে আমরা বিকল্প সম্ভাবনাগুলোকেও বিবেচনায় রেখেছি। সম্ভবত ডার্ক এনার্জি কোনো স্থায়ী গুণ নয়, বরং এক ধরনের পরিবর্তনশীল শক্তি ক্ষেত্র (যেমন “কুইন্টেসেন্স”)।

এটি সময়ের সাথে দুর্বল বা শক্তিশালী হতে পারে। ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি বোঝার জন্য DESI-সহ বেশ কয়েকটি বড় গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। কারণ, আমাদের হিসেব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মোট শক্তির ঘনত্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি জুড়ে রয়েছে এই ডার্ক এনার্জি। যদি এটি সত্যিই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট হয়, তাহলে “হিট ডেথ” একপ্রকার অনিবার্য। তখন আমরা বলতে পারি, ১০০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো এত দ্রুত সরবে যে আমরা সেগুলো আর দেখতে পাব না। এরপরে মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ নিস্তেজ ও খালি হয়ে পড়বে। কিন্তু DESI-এর সাম্প্রতিক ফলাফল এই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কনস্ট্যান্ট জিনিস বদলায় না
DESI-এর ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ডার্ক এনার্জি হয়তো সময়ের সাথে দুর্বল হয়ে আসছে। এটা এখনো চূড়ান্ত আবিষ্কার নয়, তবে যদি সত্য হয়, তবে সম্প্রসারণ এখনো দ্রুততর হচ্ছে, কিন্তু আগের তুলনায় কম। এটা কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টের আচরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেউ কেউ বলছেন, এর মানে হতে পারে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ এতটা নিরানন্দ নাও হতে পারে। সম্ভবত সম্প্রসারণ এক সময় বন্ধ হবে বা উল্টে গিয়ে “বিগ ক্রাঞ্চ”-এর দিকে ধাবিত হবে। এমন ব্যাখ্যা দিতে আমাদের এখনো অনেক সতর্ক থাকা উচিত। ডার্ক এনার্জি যদি পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে যতক্ষণ না আমরা এর প্রকৃতি পুরোপুরি বুঝি, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো সুনিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব।

ভয়ংকর সম্ভাবনাগুলো
এমনকি ডার্ক এনার্জি একসময় “ফ্যান্টম” আচরণ করতেও পারে – যেখানে এটি সময়ের সাথে আরো শক্তিশালী হয়ে যায়। এর ফলে মহাবিশ্ব নিজেই ছিঁড়ে যেতে পারে, যাকে বলে “বিগ রিপ”। অন্যদিকে, যদি ডার্ক এনার্জি সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে হারিয়ে যায়, তারপরও পরিণতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তখনও নক্ষত্রগুলি নিভে যাবে, ব্ল্যাক হোলগুলি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হবে এবং মহাবিশ্বের দ্বিতীয় আইন অনুযায়ী এলোমেলোতা বাড়তে থাকবে। এছাড়া, “ভ্যাকুয়াম ডিকেই” নামক এক ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাও আছে, যেখানে মহাবিশ্ব হঠাৎ করেই তার মৌলিক গঠন পাল্টে ফেলে, যা বেঁচে থাকার কোনো সুযোগই রাখবে না।

ডার্ক এনার্জি হয়তো একদিন সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। তবে ততদিন পর্যন্ত, একে বোঝার প্রচেষ্টা আমাদের সামনে অসাধারণ সব আবিষ্কার এনে দিচ্ছে। মহাবিশ্ব ভবিষ্যতে আর কী চমক আমাদের জন্য রেখেছে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন