ভাষারা হারায় কেন ? প্রতি ১৪ দিনে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যায়

” ভাষা কেবল শব্দ নয়। এটি একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি সম্প্রদায়ের ঐক্য, একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস যা সেই সম্প্রদায়কে গঠিত করে। একটি ভাষার মধ্যে এর সবকিছুই নিহিত থাকে,” We Still Live Here – চলচ্চিত্রে ভাষাবিদ নোম চমস্কি একথা বলেন।বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৭০০০-এরও বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে, তবে এই সংখ্যা ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। কীভাবে এবং কেন একটি ভাষা হারিয়ে যায়? ভাষা জীবন্ত থাকে তার বক্তাদের মাধ্যমে। যারা প্রতিদিন এটি ব্যবহার করে এবং নতুন শব্দ ও অভিব্যক্তি যোগ করে ভাষাটির বিকাশ ঘটান। অন্যদিকে কিছু ভাষা শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রচলিত থাকে এবং এ কারণে সেগুলোর হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

আজকের দিনে প্রায় ৩০০০-এরও বেশি ভাষাকে বিপন্ন বলে বিবেচনা করা হয়। কোনো ভাষা যখন অন্য ভাষার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তখন সেটি বিলুপ্তির দিকে এগোয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিছু ভাষা হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে। বিশেষত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত বহু আদিবাসী ভাষা যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মুছে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, এল সালভাডরে লেঙ্কা এবং কাকাপেরা ভাষার সব বক্তাকে সালভাডারের সৈন্যরা হত্যা করেছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাষাগুলি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। আমেরিকা আবিষ্কারের পর, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ ভাষা ঔপনিবেশিক প্রভাবের কারণে ধীরে ধীরে অনেক আদিবাসী ভাষার স্থান দখল করে নেয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, ভাষাগুলি বিলুপ্ত হয় যখন পরবর্তী প্রজন্ম তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ভাষায় পারদর্শিতা হারায় এবং এটি আরও মর্যাদাপূর্ণ ভাষার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়। এর একটি উদাহরণ হলো সপ্তম শতকে আরবির উত্থানের ফলে মিশরে কপটিক ভাষার ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে চলে যায়। বাংলাদেশেও বেশ কিছু ভাষা বিলুপ্তপ্রায় বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো। নিচে বাংলাদেশের কিছু বিলুপ্তপ্রায় ভাষার তালিকা দেওয়া হলো – চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের খুমি জনগোষ্ঠীর ভাষা। খুমি ভাষাভাষীদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে, এবং তরুণ প্রজন্ম বাংলা ও মারমা ভাষার প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

একসময় উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কোচ জনগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলত। বর্তমানে অধিকাংশ কোচ জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষার দিকে ঝুঁকেছে, ফলে ভাষাটি বিলুপ্তির পথে। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জে বসবাসরত হাজং জনগোষ্ঠীর ভাষা। বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রভাবের কারণে হাজং ভাষা হারিয়ে গেছে। মধুপুর গড় অঞ্চলের গারো জাতিগোষ্ঠীর একটি স্বতন্ত্র উপভাষা। এখন এটি প্রায় হারিয়ে গেছে, কারণ গারো সম্প্রদায় মূল গারো ভাষা ও বাংলার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে ধিরে ধীরে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলত। বর্তমানে ভাষাভাষীর কাউকে আর পাওয়া যায় না।

চাক ভাষার অনেক উপভাষা বাংলা ও মারমার সংমিশ্রণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সাদ্রি ভাষা সাঁওতাল, ওঁরাও এবং কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা। যা মূলত চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। বাংলা ভাষার প্রভাবে প্রজন্ম সাদ্রি ভাষা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগে। আজকের বিশ্বায়ন ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য অন্যতম প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি একরূপতা ও মানকরণের চাপ তৈরি করে। এই বৈশ্বিক প্রবণতা সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ এখন ইংরেজি আন্তর্জাতিক সংযোগের ভাষা হিসেবে সরকার, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং কূটনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব ভাষা পরিত্যাগ করে প্রধান ভাষাগুলি শেখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

কিন্তু যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন আমরা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্পূর্ণ একেকটি সভ্যতা হারিয়ে ফেলি। এ কারণেই ভাষাগুলোর সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেস্কো ২০০৫ সাল থেকে Convention on the Protection and Promotion of the Diversity of Cultural Expression চালুর মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করছে, যা সংখ্যালঘুদের তাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত কৌশল গ্রহণের অধিকার প্রদান করে। বিপন্ন ভাষাগুলোর সংরক্ষণে অনুবাদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুবাদের মাধ্যমে একটি সংখ্যালঘু ভাষা হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের কাছে পৌঁছতে পারে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, অনুবাদ ভাষাগুলোর বিলুপ্তি ঠেকাতে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন