১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বা সেবার বাইরে ব্যক্তিগত শখ পূরণের জন্য অতিরিক্ত খরচের টাকা নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাতে দেশটির ধনী-দরিদ্র বিভাজনের এই চিত্র জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। ব্লুম ভেঞ্চারস নামের একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ব্যবসা বা স্টার্টআপের পণ্যের সম্ভাব্য বাজার বা প্রকৃত ভোক্তা শ্রেণিতে মানুষ রয়েছেন মাত্র ১৩ থেকে ১৪ কোটি, যা মেক্সিকোর মোট জনসংখ্যার সমান। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ৩০ কোটি উদীয়মান বা ‘সম্ভাব্য’ ভোক্তা, যারা খুব হিসাব করে খরচ করেন।
ওই প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে ভোক্তাশ্রেণির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে না, তবে ভোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, ভারতে ধনীর সংখ্যা আসলে বাড়ছে না, বরং ধনীদের সম্পদ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওই শীর্ষ ১০ শতাংশই তাদের ক্রয়ক্ষমতার মাধ্যমে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজার ও বিক্রিকে সচল রাখছে। আর এই কারণে সাধারণ মানুষের চাহিদার দিকে মনোযোগী না হয়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ধনী ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যয়বহুল ও উন্নত পণ্য উৎপাদন এবং এসব পণ্য বিক্রিতে জোর দিয়েছে। অতি-বিলাসবহুল আবাসন এবং প্রিমিয়াম দামের ফোনের বাজার বৃদ্ধি এর উদাহরণ। অথচ কমদামী আবাসন ও ফোনের বাজার সেই তুলনায় খুবই কম বেড়েছে। ব্র্যান্ডেড পণ্যের বাজারের আকারও বেড়েছে। পাশাপাশি, ‘এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি’ বা ‘অভিজ্ঞতা অর্থনীতি’ তথা বিনোদন ও বিলাসব্যসনের প্রতি মানুষের আগ্রহ তীব্রভাবে বেড়েছে।
কোভিড পরবর্তী ভারতে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর দরিদ্ররা ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছেড়প্রতিবেদনটি দীর্ঘদিনের এই ধারণাকে আরও সুসংহত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, এই প্রবণতা মহামারির আগেই শুরু হয়েছিল। ভারতে আয়বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ১০% জনগণের হাতে জাতীয় আয়ের ৫৭.৭% কেন্দ্রীভূত, যেখানে ১৯৯০ সালে এই হার ছিল ৩৪%। অন্যদিকে, দেশটির নিম্ন স্তরের ৫০% জনগণের আয়ের অংশ ২২.২% থেকে কমে ১৫%-তে নেমে এসেছে। তবে সম্প্রতি ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্থবিরতা কেবল ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে নয়, বরং সাধারণ জনগণের আর্থিক সঞ্চয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং ঋণের বোঝা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলেও হয়েছে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যা এত দিন ভোক্তা বাজারের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজারসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে তাদের আয় কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
এ ছাড়া, বেকারত্বের নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেছে, হোয়াইট-কলার (মেধাভিত্তিক) চাকরির সংকট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে দাপ্তরিক ও রুটিন কাজ দ্রুত স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে এই চাকরিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে শ্রমবাজারে স্থানচ্যুতি বিশেষত ভারতের মতো পরিষেবানির্ভর অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়, যেখানে আইটি খাতের একটি বড় অংশ কম মূল্য সংযোজনমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত এবং যা অটোমেশনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বড় একাধিক দেশের মতো ভারতও একটি ভোেগ নির্ভর অর্থনীতি। ফলে আর্থিক বৈষম্য এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি হ্রাস পেলে অর্থনীতির গতি শ্লথও হয়ে পড়তে পারে।


