ভারতে ওয়াকফ বিল পাস বিতর্কের সুত্র কী ?

ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় কোনো বাধা ছাড়াই পাস হওয়া বিতর্কিত ওয়াক্ফ বিলটি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়ও পাস হয়েছে। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ১২৮টি এবং বিপক্ষে ৯৫টি ভোেট পড়ে। এই বিলের মাধ্যমে ওয়াক্ত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে, যা নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দল তাদের সাত এমপিকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেওয়ার অনুমতি দেয়। দলীয় নেতা সস্মিত পাত্র জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুভূতির কথা বিবেচনা করেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজ্যসভায় বিতর্ক চলাকালে বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজ্জু বলেন, বিলটি মুসলিম স্বার্থের ক্ষতি করবে না।বরং এর লক্ষ্য দুর্নীতি দূর করা এবং সম্পত্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নতুন আইনে ওয়াক্ফ সম্পত্তি ঘোষণার আগে মালিকানার যথাযথ প্রমাণ দিতে হবে, যেটি পূর্বে প্রয়োজন ছিল না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই বিলের পক্ষে মত দেন এবং জানান, বেশ কিছু সম্পত্তি অবৈধভাবে ওয়াক্ফ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তিনি উদাহরণ হিসেবে দিল্লির ল্যুটিয়েন্স জোন, তামিলনাড়ুর ৪০০ বছরের পুরোনো মন্দির, পাঁচতারকা হোটেলের জন্য নির্ধারিত জমি এবং পুরোনো সংসদ ভবনের কথা উল্লেখ করেন।

কংগ্রেসের এমপি সৈয়দ নাসির হুসেন অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং ওয়াক্তের অধিকার খর্ব করতে চাইছে।তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ল্যুটিয়েন্স এলাকায় এই সম্পত্তিগুলো ওয়াক্তের নামে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং এগুলো আইনগতভাবেই ওয়াক্ত বোর্ডের অধীনে রয়েছে। কংগ্রেসের নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বিলটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরকার বিরোধ সৃষ্টি করছে এবং জনগণের মধ্যে বিভক্তি বাড়াচ্ছে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘যদি শিরডি সাইবাবা ট্রাস্ট বা তিরুপতি মন্দির ট্রাস্টে কোনো মুসলিম সদস্য না থাকেন, তাহলে ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে কেন?’ অল ইন্ডিয়া ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) নেতা ইমতিয়াজ জলিলও একই প্রশ্ন তোলেন। তিনি দাবি করেন, এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় সিদ্ধান্ত।

বিলে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো কেন্দ্রীয় ওয়াক্ফ্ফ কাউন্সিল এবং বিভিন্ন রাজ্যের ওয়াক্ফ বোর্ডে দুজন অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা। পাশাপাশি কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালন করা ব্যক্তিরাই ওয়াক্তে সম্পত্তি দান করতে পারবেন বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে, সরকার কীভাবে নির্ধারণ করবে কে প্রকৃত মুসলিম এবং কে পাঁচ বছর ধরে ধর্ম পালন করেছেন। নতুন আইনে বলা হয়েছে, ওয়াক্ফ বোর্ড দাবি করা কোনো সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়াক্ত বলে গণ্য হবে না। বরং সম্পত্তির মালিকানার বিষয়টি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন স্থানীয় কালেক্টর। এ ছাড়া বিরোধের ক্ষেত্রে একজন সরকারি কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে, পূর্ববর্তী আইনে ওয়াক্ত ট্রাইব্যুনালের হাতে ছিল।

এই পরিবর্তন ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছে, এটি ওয়াক্ফ্ফ সম্পত্তির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা। বিরোধীরা যুক্তি দিচ্ছেন, মুসলিম দেশগুলো যেখানে ওয়াকফ সম্পত্তির ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা করছে, সেখানে ভারতেও স্বচ্ছতা আনার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা করতে গিয়ে ওয়াকফ বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ণ করা উচিত নয়। ওয়াক্ফ্ফ বিলের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিজেপি সরকার এটিকে দুর্নীতি রোধ এবং স্বচ্ছতা আনয়নকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখালেও বিরোধীরা একে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার খর্ব করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এই আইন কার্যকর হলে এর বাস্তব প্রভাব কী হয়, তা দেখার বিষয়।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন