“… ২০১৬ ও ২০১৯ সালে কাশ্মীর নিয়ে শেষবার দুই দেশের মধ্যে বড় রকমের সংঘর্ষ হয়। তখন পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে একদল অপ্রত্যাশিত খেলোয়াড়। তারা হলো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। বিশেষ করে সৌদি আরব এখন শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর সম্প্রতি হঠাৎ ভারত সফরে আসেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, উত্তেজনা প্রশমনে সাহায্য করা। সৌদি আরবের পক্ষে এই শান্তির চেষ্টা খুবই স্বাভাবিক। কারণ, সৌদিতে বর্তমানে প্রায় ২৬ লাখ ভারতীয় শ্রমিক কাজ করেন। সেখানে আছেন প্রায় সমানসংখ্যক পাকিস্তানিও।
কাশ্মীর হামলার সময় মোদি ছিলেন জেদ্দায়। সেখানে তিনি ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেই সঙ্গে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি নিয়েও কথা হচ্ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশের চারপাশের কূটনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখন অনেক বেড়েছে।
আগে সেখানে আদর্শ ও ধর্ম ছিল পররাষ্ট্রনীতির চালিকা শক্তি। এখন সেখানে জায়গা নিয়েছে স্বার্থ। এরই উদাহরণ হলো সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা।
… এখন সৌদি আরব ছাড়াও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখানে যুক্ত। তবে তারা তাদের পুরোনো কায়দামতো এখন আর ধর্মীয় সংহতির দোহাই দিয়ে আগুনে ঘি ঢালছে না। কাশ্মীর সমস্যায় কাতার ও আরব আমিরাত পাকিস্তানকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি ভারতের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে কাতার। অন্তত ভারতের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এমনটাই বলা হচ্ছে।
… ধর্ম, আদর্শ বা মূল্যবোধ নয়; এখানে সবকিছুর কেন্দ্রে আছে কেবল স্বার্থ। বহু বছর ধরে পাকিস্তান ধরেই রেখেছিল যে, মুসলিম দেশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলো তার পাশে দাঁড়াবেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে এই ধারণা বদলানো ছাড়া পাকিস্তানের উপায় নেই।
ধর্মীয় পার্থক্য ও আদর্শগত অমিল থাকা সত্ত্বেও ভারত আজ উপসাগরীয় অঞ্চলে এক প্রভাবশালী বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
… পাকিস্তান যেমন মুসলিম দেশ, তার প্রতিবেশী ইরানও শিয়া মুসলিম দেশ। পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিয়া মুসলিম বাস করেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের সম্পর্কই তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতীয়দের উদ্দেশে আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে তেহরান। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামাবাদ থেকে সরাসরি দিল্লিতে এসে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন।
ইরানের সঙ্গে ভারতের বহু পুরোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এর একটি বড় অংশ চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন ও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত। এই প্রকল্পে ভারত ইতিমধ্যে ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দিয়েছে আরও ২৫ কোটি ডলারের ঋণ। উপসাগরীয় অনেক দেশের মতো ইরানও এখন ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলের কোনো পক্ষই চায় না ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ হোক।…কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমানো গেলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান হবে না। এখন থেকে এই অঞ্চলে শান্তি রক্ষা করতে হলে চাই লাগাতার আন্তরিক এবং সতর্ক মধ্যস্থতা। “


