ডোরিস ডে ১৯৫৬ সালে তাঁর জনপ্রিয় গান “Que Sera Sera” গেয়েছিলেন, যার চরণগুলো মানবজাতির একটি গভীর এবং সর্বজনীন অনুভূতির প্রতীক “Que sera sera, whatever will be will be… ভবিষ্যৎ আমাদের দেখার নয়।” এই গানের মাধ্যমে তিনি একটি অজানা ভবিষ্যতের ব্যাপারে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং সন্দেহকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এটি এমন একটি অনুভূতি, যেটি মানবজীবনে প্রকৃতির অদৃশ্যতা ও অনিশ্চয়তার সাথে সম্পর্কিত। তার কথাগুলো আজও আমাদের হৃদয়ে বাসা বেঁধে রয়েছে, কারণ ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের চিন্তা, তাতে আশা বা ভয়, সবই আমাদের সামগ্রিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মানবজীবনে আমাদের অনেক কিছু পূর্বনির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যত আমাদের কাছে সবসময়ই অজানা। স্মৃতি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, আর পরোক্ষভাবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান আমরা পেতে পারি, যা প্রায় নিশ্চিত—যেমন: আমরা জানি আগামীকাল সূর্য উঠবে বা জানালায় পাথর ছুঁড়লে তা ভেঙে যাবে। কিন্তু ২০১৫ সালের ক্রিসমাস ইভে, আমি জানতাম না যে ইয়র্ক শহরে বন্যা হবে। এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করে যে, আসলে ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের যে অনুভূতি রয়েছে, তা কতটা অস্বচ্ছ এবং আপেক্ষিক।
প্রাচীন যুগে মানুষ ভবিষ্যত নিয়ে অজ্ঞতা কাটাতে বিভিন্ন রূপকথা এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল। তারা এসব ঘটনা দেবতার ইচ্ছার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করত—যেমন: যদি বৃষ্টি না হয়, তবে তারা বিশ্বাস করত বৃষ্টির দেবতা খুশি নন। আজকের দিনে যদিও আমরা ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছি, তবুও আমাদের ভবিষ্যতকে জানার অক্ষমতা কিংবা তার অনিশ্চয়তা, এখনো এক ধরনের রহস্য তৈরি করে।
আধুনিক যুগে এসে অ্যারিস্টটল প্রথমে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত বা পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এটি তখনও ঘটেনি এবং এর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁর ধারণাটি আজকের আধুনিক যুক্তিবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক ছিল। তিনি ভবিষ্যত-সংক্রান্ত বিবৃতিকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখেন, যেখানে সেটি সত্য বা মিথ্যা হওয়ার আগেই তার অবস্থান ঠিক করা সম্ভব নয়।
নিউটন এবং ল্যাপ্লাসের মতে, ভবিষ্যতকে গণনা করার জন্য যদি আমরা বর্তমানের সমস্ত তথ্য জানতাম তবে তা সম্ভব হত। তাঁরা বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর ছোট থেকে বড় প্রতিটি ঘটনা নির্দিষ্টভাবে গণনা করা সম্ভব। তবে ২০শ শতাব্দীতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আবির্ভাব এই ধারণাকে ভেঙে দেয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, পরমাণু স্তরের ঘটনাগুলো যদৃচ্ছ (random) হতে পারে এবং একটি নির্দিষ্ট “পথ” অনুসরণ করে না।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্রানুযায়ী, ইলেকট্রন একই সময়ে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে থাকতে পারে এবং এর গাণিতিক ব্যাখ্যা শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণে দেওয়া হয়েছে। এই সমীকরণটি সম্ভাবনা-ভিত্তিক, যার মানে হচ্ছে, আমরা কোনো পরমাণু স্তরের অবস্থাকে নির্ধারণ করতে পারি না যতক্ষণ না তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত বিড়াল চিন্তন পরীক্ষাটি আমাদের জানায়, একটি বিড়াল একই সাথে জীবিত ও মৃত থাকতে পারে (সুপারপজিশন অবস্থায়), তবে আমরা কোন একটি অবস্থান দেখে শুধুমাত্র একটি ফলাফল দেখতে পাই।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স দুটি দৃষ্টিকোণ প্রকাশ করে, মহাবিশ্বের কোয়ান্টাম স্টেট ভেক্টর সকল সম্ভাবনার উপস্থিতি ধারণ করে। এখানে একাধিক “বাস্তবতা” সমান্তরালভাবে বিদ্যমান থাকে।
আমরা শুধুমাত্র একটি ফলাফল দেখতে পাই, যেমন: বিড়ালটি বেঁচে আছে, এবং বাকি সমস্ত সম্ভাবনা আমাদের চোখের সামনে আসে না। এগুলি “অঘটিত সম্ভাবনা” হয়ে থাকে।
এটি বুঝিয়ে দেয় যে, আমাদের অভিজ্ঞতা বাস্তবতা সম্পর্কে সীমিত এবং একমাত্র দৃশ্যমান ফলাফলটি আমাদের উপলব্ধি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। যদিও অনেক সম্ভাবনা একযোগে বিদ্যমান থাকতে পারে, আমরা কেবল একটি বাস্তবতার সাথে পরিচিত।
কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী ভবিষ্যত সংক্রান্ত কোনো বিবৃতির “সত্য মান” ০ থেকে ১-এর মধ্যে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যদি “আগামীকাল বৃষ্টি হবে” বিবৃতির সত্য মান ০.৮ হয়, তবে তার মানে ৮০% সম্ভাবনা রয়েছে যে আগামীকাল বৃষ্টি হবে। এই অবস্থায় ভবিষ্যত আর একটি নিখুঁত বা একক সত্য হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
শেষ পর্যন্ত, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান মৌলিকভাবে সীমাবদ্ধ। এটি শুধুমাত্র অজানা নয়, বরং এর কোনো নির্দিষ্ট “সত্য”ও নেই। তবে আমরা ভবিষ্যতকে আংশিক সত্য বা সম্ভাবনা হিসেবে উপলব্ধি করতে পারি। কোয়ান্টাম তত্ত্ব আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে ধারণা পাল্টে দিয়েছে, যেখানে একটি বাস্তবতার পরিবর্তে সম্ভাবনার মধ্যে নানা অজ্ঞেয়তা থাকে। একে আমরা “Que Sera Sera”—”যা হবে তা হবে”—এই বিশ্বাসে বিশ্বাস করতে শিখেছি। জীবন চলতে থাকবে, আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকা পরিস্থিতির মধ্যে, কিন্তু তার সঠিক সত্যকে জানার ক্ষমতা আমাদের অক্ষম।


