ব্যক্তিসত্তার দ্বৈত পথে : Left-hand Path এবং Right-hand Path

মানব সভ্যতার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে দুইটি ধারার অস্তিত্ব সবসময় বিদ্যমান থেকেছে, একটি ঐতিহ্য, সমাজ ও ঈশ্বরকেন্দ্রিক। অপরটি বিদ্রোহ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও শক্তিকেন্দ্রিক। এই দুই ধারাকে পশ্চিমা ওককাল্ট চর্চায় বলা হয় “Right-hand path” (ডান হাতের পথ) এবং “Left-hand path” (বাম হাতের পথ)। এ শব্দদ্বয় পশ্চিমা দর্শনের হলেও এদের মূল ধারণা বহু পূর্বে হিন্দু ও বৌদ্ধ তন্ত্রশাস্ত্রেও বিদ্যমান ছিল।

Right-hand path মূলত ধর্মীয় অনুশাসন, সমাজ স্বীকৃত নৈতিকতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নতির ধারণা তুলে ধরে। এই পথে চর্চাকারীরা ঈশ্বর বা কোনো উচ্চতর শক্তির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্য হয় আত্মাকে শুদ্ধ করে মোক্ষ, নির্বাণ বা পরিত্রাণ লাভ করা।

এই ধারা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, অহং দমন, ধর্মীয় নিয়ম অনুসরণ এবং করুণাবোধের ওপর গুরুত্ব দেয়। হিন্দুধর্মের ভক্তিমার্গ, বৌদ্ধ ধর্মের মৈত্রীপূর্ন ধ্যান এবং খ্রিস্টধর্মে যীশুর প্রতি আত্মসমর্পণ—all represent Right-hand path। এসব পথ বিশ্বাস করে যে আত্মার মুক্তির জন্য নিজেকে ইন্দ্রিয়গত কামনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে চলতে হবে।

Left-hand path মূলত সেই আধ্যাত্মিক পথ যা প্রচলিত নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি ইচ্ছাশক্তি, গোপন জ্ঞান ও শক্তির মাধ্যমে উন্নতির কথা বলে। এই পথ চর্চাকারীরা বিশ্বাস করেন ঈশ্বর বা সামাজিক নিয়ম নয়, নিজের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ শক্তি।

বাম পথের চর্চায় পাওয়া যায় গোপনীয়তা, ট্যাবু ভাঙা, যৌনতা, মৃত্যু বা শ্মশানের সঙ্গে সম্পর্কিত সাধনার উপাদান। হিন্দু তন্ত্রসাধনায়, বিশেষ করে অঘোরী ও বামাচারী তন্ত্রে এর প্রমাণ রয়েছে। পশ্চিমা জগতে এটি দেখা যায় স্যাটানিজম, লুসিফারিয়ানিজম, ও অন্যান্য ব্ল্যাক ম্যাজিক ও ওকাল্ট চর্চায়।

এ পথে আত্মাকে নয় বরং ব্যক্তিসত্তাকে শক্তিশালী ও পরিপূর্ণ করা হয় লক্ষ্য। এই পথে ঈশ্বরকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয় বরং প্রতিপক্ষ বা নিজেই ঈশ্বর হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়।

এই দুই পথের মূল পার্থক্য নিহিত আছে “নিয়ন্ত্রণ বনাম স্বাধীনতা”, “আনুগত্য বনাম বিদ্রোহ” এবং “ঈশ্বরমুখীনতা বনাম আত্মমুখীনতা”-তে। ডান পথ যেখানে আত্মাকে শুদ্ধ করতে চায়, বাম পথ আত্মাকে স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী করে তুলতে চায়, তা যত বিপজ্জনকই হোক না কেন।

বাম হাতের পথ ও ডান হাতের পথ, এই দুই পথের মাঝে শুধুই পছন্দের পার্থক্য নয় রয়েছে গভীর দর্শনগত দ্বন্দ্ব। একদিকে রয়েছে সমাজের শুদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণের আহ্বান, অপরদিকে রয়েছে বিদ্রোহ, আত্মজিজ্ঞাসা ও নিষিদ্ধ জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ। এরা উভয়ে আধ্যাত্মিকতার এক অনন্ত দ্বন্দ্বের দুটি মেরু, যা যুগে যুগে সাধক, দার্শনিক ও কবিদের মনের গভীরে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে, আত্মা কি মুক্তির জন্য নিবেদিত হবে, না নিজেই ঈশ্বর হয়ে উঠবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন