যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল আইফোন তৈরিতে ‘বিরল মৃত্তিকা ধাতু’ আমদানি করে চীন থেকে। যদিও চীন থেকে ভবিষ্যতে এই বিরল খনিজ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনা পণ্যে উচ্চহারে যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তার পাল্টা হিসেবে চীন যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া অথবা বিধিনিষেধ আরোপের পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিরল খনিজ শুধু আইফোনের মতো মুঠোফোন তৈরি নয়, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যেকোনো যন্ত্র বা সরঞ্জাম তৈরিতেই তা কাজে লাগে। সামরিক সরঞ্জাম ও আধুনিক অস্ত্র তৈরিতেও এখন ব্যবহার করা হয় বিরল খনিজ। বিশেষ করে বিরল খনিজ লাগে চিপ তৈরিতে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিরল খনিজের লড়াই একুশ শতকের ভূ-অর্থনৈতিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই লড়াইয়ে চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট বিকল্প সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে সক্রিয়। এদিকে বাংলাদেশে বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। দেশের গবেষকেরা বলছেন – নদী অববাহিকার বালু, জেগে ওঠা চর, সৈকত বালু এবং কয়লাখনি থেকে বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে দেশে সন্ধান পাওয়া এই মূল্যবান খনিজের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতটুকু, তা পর্যালোচনা করতে হবে।
১৭টি মৌলের একটি গ্রুপ হলো বিরল খনিজ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির (আইইউপিএসি) নামকরণ অনুযায়ী, পর্যায় সারণির ল্যান্থানাইড সিরিজের ১৫টি মৌলের (ল্যান্থানাম, সিরিয়াম, প্রাসিয়োডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রমিথিয়াম, স্যামারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হোলমিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম ও লুটেশিয়াম) সঙ্গে স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়ামকে একত্রে বিরল খনিজ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওসায়েন্স ইনস্টিটিউট। সংস্থাটি বলছে – আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। তবে এদের উত্তোলন এবং পৃথক্করণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য বলছে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ মজুতের অধিকারী। দেশটিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন বিরল খনিজ মজুত আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল, দেশটির মজুতের পরিমাণ ২ কোটি ১০ লাখ টন। এ ছাড়া ভারতে ৬৯ লাখ টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৭ লাখ টন, রাশিয়ায় ৩৮ লাখ টন, ভিয়েতনামে ৩৫ লাখ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ লাখ টন বিরল খনিজের মজুত আছে। উৎপাদনের দিক থেকেও চীন শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৪ সালে দেশটি ২ লাখ ৭০ হাজার টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। একই বছর ব্রাজিল ও ভারত ২ হাজার ৯০০ টন, রাশিয়া ২ হাজার ৫০০ টন এবং যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ হাজার টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। আর ১৩ হাজার টন উৎপাদন নিয়ে চতুর্থ স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশে আলাদাভাবে বিরল খনিজ খোঁজার সরকারি উদ্যোগ নেই। তবে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) কয়েকটি গবেষণায় দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বিরল খনিজের সন্ধান পায়। গত বছর সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে গাইবান্ধা জেলায় প্রায় ২ হাজার ৩৯৫ হেক্টর এলাকার যমুনা নদীর বালি থেকে বাণিজ্যিকভাবে ভারী খনিজ সংগ্রহ শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি এভারলাস্ট মিনারেলস । তবে দেশে প্রাপ্ত বিরল খনিজের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করতে আরও বেশি গবেষণা করতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধা প্রয়োজন। প্রতিবছর ১ বিলিয়ন টন পরিমাণ বালু দেশের নদীগুলো বহন করে আনে। ফলে বালুতে থাকা বিরল খনিজ আহরণ করতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।


