২ এপ্রিলকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের প্রায় সব দেশ, তা সে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হোক বা শত্রু, সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে গত ৫০ বছরে অর্থনৈতিকভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা বন্ধ হয়েছে; মানুষের চাকরি গেছে; কিন্তু তিনি আর সেটা হতে দেবেন না। সে কারণে তাঁর পারস্পরিক শুল্ক। সিএনএনের সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া এক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাস্তবতা হলো ট্রাম্পের দাবি মিথ্যা। বরং গত তিন দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য বৃহৎ বা তাদের গোত্রীয় অর্থনীতিকে ফেলে অনেক দূর এগিয়েছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ছিল ইউরোজোন বা ইউরো অঞ্চলের প্রায় সমান—যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ১৪.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার আর ইউরো অঞ্চলের ১৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে মার্কিন জিডিপি ইউরো অঞ্চলের প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—২৭.৭২ ট্রিলিয়ন ডলার, যেখানে ইউরো অঞ্চলের ১৫.৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের গড় মজুরি ওইসিডিভুক্ত বা ধনী দেশগুলোর তুলনায় ছিল ২২.৩% বেশি। এখন সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৬%। অন্যদিকে ১৯৯৫ সালে জাপানের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৫৪% বেশি ছিল। ২০২৩ সালে মার্কিনদের মাথাপিছু জিডিপি জাপানিদের তুলনায় ছিল ১৪৫% বেশি। বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপানের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র খারাপ ছিল না। ফরিদ জাকারিয়া বলছেন, এই চিত্তাকর্ষক তথ্য সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের উল্টো পতন হয়েছে। ট্রাম্পের বিশ্ববীক্ষা এখনো ১৯৬০-এর দশকে আটকে আছে বলে মনে করেন ফরিদ জাকারিয়া। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় উৎপাদনশীল শক্তি ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সেবা ও প্রযুক্তি ট্রাম্পের কাছে কিছুই মনে হয় না। এ কারণে তিনি বারবার উদাহরণ দেন, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের হিস্যা কমেছে। পাল্টা শুল্কের হিসাবও করা হয়েছে পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতির হিসেবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রায় ৭৫%ই এই সেবা—সফটওয়্যার, সংগীত, চলচ্চিত্র, ব্যাংকিং, আইন ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এমনিতেই সুরক্ষাবাদী ছিল। তাদের শুল্ক ও অশুল্ক বাধার পরিমাণ বিশ্বের ৬৮টি দেশের চেয়ে বেশি ছিল। নতুন এই শুল্কের মধ্য দিয়ে তাদের শুল্কহার ১৯৩০-এর দশকের স্মুট হাওলির শুল্ক হারের চেয়ে বেশি হয়ে গেল। এমনকি ট্রাম্প ১৯ শতকের শুল্ক যুগের স্মৃতিচারণা করেন। তখন আয়কর ছিল না, ছিল শুধু শুল্ক। সেই বাস্তবতায় ফিরে গেলে যুক্তরাষ্ট্র তখনকার মতো দরিদ্র ও দুর্নীতিপ্রবণ দেশে পরিণতি হতে পারে বলে মনে করেন ফারিদ জাকারিয়া।
অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এখন ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্যোত্তর যুগ চলছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পোস্ট-ট্রুথ যুগে মানুষ কোনো ঘটনা বা তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে বরং আবেগ, অনুভূতি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে। এখানে তথ্য বা যুক্তির চেয়ে ব্যক্তিগত আবেগ ও বিশ্বাস মুখ্য হয়ে ওঠে। ট্রাম্প এই পোস্ট–ট্রুথের অন্যতম সেরা কারিগর। ফলে মানুষকে তিনি বিশ্বাস করাতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


