বাইবেলের সবচেয়ে ভুল বোঝা নারী, মেরী ম্যাগডালিন আসলে কে ছিলেন?

মেরী ম্যাগডালিন বাইবেলের অন্যতম পরিচিত এবং একই সাথে সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র। তাকে কখনো বলা হয়েছে অপদেবতাগ্রস্ত নারী, কখনো গণিকা, আবার কখনো যিশুর স্ত্রী। যিশু খ্রিস্টের অনুসারী হিসেবে তার জীবন সম্পর্কে গত দুই হাজার বছরে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু তার সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনো অজানা। তাকে প্রায়শই বাইবেলের আরেকজন নারী চরিত্র, মেরী অব বেথানি’র সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এমনকি তার লেখা একটি গসপেলের অস্তিত্ব নিয়েও বিতর্ক আছে। তার প্রকৃত নাম, জন্মস্থান ও জন্মসাল, এমনকি তার মৃত্যু নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে তার সম্পর্কে আমরা কী জানি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কী বলে?

মেরী ম্যাগডালিন সম্পর্কে বেশিরভাগ তথ্য পাওয়া যায় বাইবেলের ক্যানোনিকাল গসপেলগুলো থেকে, যেগুলো ম্যাথিউ, মার্ক, লুক এবং জন-এর নামে প্রচলিত। এই গ্রন্থগুলো তাকে যিশুর ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের একজন হিসেবে তুলে ধরে এবং তিনিই প্রথম যিশুর খালি কবর আবিষ্কার করেন। একই সাথে তিনিই ইস্টার সকালে যিশুর মৃতদেহকে সুগন্ধি তেল মাখিয়েছিলেন।

তবে এই গসপেলগুলো তার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে একমত নয়। যেমন লুকের গসপেলে বলা হয়েছে মেরী সাতটি অপদেবতা দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলেন, যদিও অন্যান্য গসপেলে এমন কোনো উল্লেখ নেই। মার্কের গসপেলে তাকে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বাইবেলের বাইরের কিছু প্রাচীন খ্রিস্টীয় লেখাতেও মেরীর সাথে যিশুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় পুরুষ শিষ্যরা মেরীকে হেয় করে দেখতেন, কারণ তিনি একজন নারী। যুক্তরাষ্ট্রের স্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ টেস্টামেন্ট-এর অধ্যাপক জেমস আর. স্ট্রেঞ্জ বলেন, “পুরুষ শিষ্যরা তাকে অবজ্ঞা করত, কারণ তিনি একজন নারী ছিলেন।”

এই সব প্রাচীন গ্রন্থ থেকে গবেষকরা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ টেস্টামেন্ট-এর সহকারী অধ্যাপক এলিজাবেথ শ্র্যাডার পোলকজার বলেন, “অন্যান্য নারীদের মতো মেরী ম্যাগডালিনের নাম কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্কিত করে লেখা হয়নি। এতে বোঝা যায় মেরী একজন স্বাধীন নারী ছিলেন।”

বাইবেলে তার জীবনের এই অস্পষ্টতা নানা ধরনের গুজব, ভুল ধারণা এবং জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাটি হলো, মেরী একজন গণিকা ছিলেন। এই ভুল ধারণাটি ৫৯১ খ্রিস্টাব্দে পোপ গ্রেগরী প্রথমের একটি ভুলের কারণে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি মেরীকে লুকের গসপেলে উল্লিখিত একজন “পাপী নারী”-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। এর কোনো সত্যতা নেই, কিন্তু এই ধারণাটি আজও অনেক মানুষের মনে গেঁথে আছে।

ইতিহাসবিদরা শুধু পাঠ্য প্রমাণের ওপর নির্ভর করেন না। প্রত্নতত্ত্বও বাইবেলে বর্ণিত জগৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তবে প্রত্নতত্ত্বের চ্যালেঞ্জও আছে। অধ্যাপক স্ট্রেঞ্জ বলেন, “প্রাচীন কোনো ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হতে পারে তার নাম কোনো শিলালিপি, কোনো সিনাগগের মোজাইক ফ্লোর বা কোনো সারকোফ্যাগাসের ওপর খোদাই করা।” সাধারণত ধনী বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের নামই এসব জায়গায় পাওয়া যায়।

মেরীর ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রমাণ কি পাওয়া গেছে? মেরীর জগতের সন্ধানে প্রথম যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে তার জন্মস্থান বলে কথিত জায়গাটি খনন করা। ঐতিহ্যগতভাবে “ম্যাগডালিন” নামটি তার জন্মস্থান, মাগদালা, থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। তাই তাকে প্রায়শই “মেরী অব মাগদালা” বলা হয়।কিন্তু মাগদালা ঠিক কোথায় ছিল? প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিকরাও এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না।

এটি সম্ভবত গ্যালিল সাগরের কাছে কোথাও ছিল। মাগদালা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকল্পের পরিচালক মারসেলা জাপাতা-মেজা বলেন, “এমন অনেক গল্প আছে যেখানে তীর্থযাত্রীরা গ্যালিল সাগরের তীরে মেরী ম্যাগডালিনের বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন,” এই অঞ্চলটি যিশুর কর্মস্থল ছিল। ষষ্ঠ শতকের মধ্যে প্রাথমিক খ্রিস্টানরা গ্যালিল সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষকে “মাগদালা” বলে উল্লেখ করতে শুরু করেন।

তবে শ্র্যাডার পোলকজার এবং কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক জোয়ান ই. টেইলর দাবি করেন, এই স্থানটি মেরীর বাড়ি ছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই।শ্র্যাডার পোলকজার বলেন, “প্রথম শতাব্দীতে এই স্থানটি তার গ্রিক নাম ‘তারিখাইয়া’ নামে পরিচিত ছিল। যিশুর জীবদ্দশায় এটি মাগদালা নামে পরিচিত ছিল না।” তিনি আরও যোগ করেন, “মেরীকে ‘মেরী অব মাগদালা’ বলা একটি ভুল ধারণা, কারণ কোনো গসপেল লেখক তাকে এভাবে উল্লেখ করেননি। গসপেল লেখকরা তাকে ধারাবাহিকভাবে ‘মেরী দ্য ম্যাগডালিন’ বা ‘দ্য ম্যাগডালিন মেরী’ বলে ডাকেন। ‘ম্যাগডালিন’ একটি সম্মানসূচক উপাধি হতে পারে,কিন্তু জন্মস্থান নির্দেশ করে না।”

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারত। মাগদালায় খননকার্য মেরীর জগত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। ২০০৯ সালে গবেষকরা সেখানে একটি প্রাচীন সিনাগগ এবং একটি খোদাই করা পাথর আবিষ্কার করেন যাতে একটি সাত-প্রদীপ বিশিষ্ট বাতি চিত্রিত ছিল। এটি দেখায় যে প্রথম শতাব্দীর মাগদালার বাসিন্দারা কীভাবে ধর্ম পালন করত। তারা আরও ব্যবহৃত জলের স্থাপনাও খুঁজে পেয়েছেন যেগুলো ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি ছিল একটি বিলাসবহুল ব্যবস্থা। জাপাতা-মেজা বলেন, “এই সুবিধাগুলোতে ভূগর্ভস্থ জল আসত, যা তাদের ইসরায়েলের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ করে তুলেছিল।”

কিন্তু জাপাতা-মেজা জোর দিয়ে বলেন, “মেরী ম্যাগডালিন সম্পর্কে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।” অন্যান্য গবেষকরা মেরীর দেহাবশেষ ফ্রান্স বা জেরুজালেমের প্রথম শতাব্দীর কোনো কবরে খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করলেও একাডেমিক মহলে এসব দাবির কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।

মেরী সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনো অজানা হলেও পণ্ডিতরা তার জীবন ও কাজ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য খুঁজে চলেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রাচীন প্যাপিরাস খণ্ড নতুন কিছু ধারণা দিতে পারে।

শ্র্যাডার পোলকজার বলেন, “মেরী ম্যাগডালিন যিশুর ঘনিষ্ঠতম শিষ্যদের একজন হতে পারেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্যাপিরাস খণ্ডটি এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে, কারণ এতে যিশু মেরী নামের এক নারীকে কীভাবে ‘অনন্ত, অবিনশ্বর আলোর প্রতিচ্ছবি’ হতে হয়, তা শেখাচ্ছিলেন।” তবে প্যাপিরাসটিতে স্পষ্টভাবে নারীকে মেরী ম্যাগডালিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

তা সত্ত্বেও শ্র্যাডার পোলকজার স্বীকার করেন তার জীবনের মৌলিক বিবরণগুলো এখনো অজানা। “মেরী ম্যাগডালিন সম্পর্কে অনেক কিছুই হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না তার জন্ম কোথায় হয়েছিল, তার পরিবার কে ছিল, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় তার বয়স কত ছিল, বা ইস্টারের ঘটনার পর তার কী হয়েছিল।”

তাহলে কেন গবেষকরা মেরী ম্যাগডালিনের রহস্যের পেছনে ছুটে চলেছেন? কারণ তার গল্প খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে এক ভিন্ন আলোকপাত করে। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার জীবন সম্পর্কে তথ্যের অভাবে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত হয়েছে। তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও আছে। শ্র্যাডার বলেন, “শত শত বছর ধরে মেরী গণিকা এবং ‘পথভ্রষ্ট নারীদের’ পৃষ্ঠপোষক সাধু হিসেবে কাজ করেছেন।”

মেরী ম্যাগডালিন সেই সব মানুষের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যারা ঐতিহাসিকভাবে সমাজে প্রান্তিক ছিলেন। মধ্যযুগীয় এবং প্রাথমিক আধুনিক কুষ্ঠরোগীদের হাসপাতালগুলোর নামকরণ করা হতো তার নামে। অনেকেই তাকে এমন একজন হিসেবে দেখেন যিনি সেইসব মানুষের পক্ষে দাঁড়ান যাদের সমাজ অবহেলা-প্রত্যাখ্যান বা উপেক্ষা করে।

শ্র্যাডার পোলকজার বলেন, “যাদের কণ্ঠ এবং গল্প শোনা হয়নি বা মূল্যায়ন করা হয়নি, মেরী ম্যাগডালিন তাদের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন