বাংলাদেশে চার কোটি মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। এখানে দারিদ্র্যের মানে শুধু আয়ের অভাব নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক জীবনযাত্রার সুযোগের সীমাবদ্ধতাকেও বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে দারিদ্র্যের জালে আটকা পড়েছে।
বহুমুখী দারিদ্র্যের সূচক (MPI) কীভাবে কাজ করে?
MPI বা মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সূচক মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক থেকে বঞ্চনার মাত্রা পরিমাপ করে। এটি তিনটি প্রধান ক্ষেত্রকে বিবেচনায় নেয়: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং জীবনযাত্রার মান। যদি কোনো ব্যক্তি এই তিনটির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়, তাকে বহুমুখী দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এর মাধ্যমে শুধুমাত্র আয়ের বাইরে আরও বাস্তব ও সমগ্র দারিদ্র্যের চিত্র পাওয়া যায়।
২০১৯ সালের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্যের মাত্রা
২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুসারে, দেশের ২৪ শতাংশ মানুষ বা প্রায় এক চতুর্থাংশ বহুমুখী দারিদ্র্যের কবলে ছিল। যা আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত দারিদ্র্যের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, সামাজিক ও মৌলিক সেবায় বঞ্চনাও একটি বড় সমস্যা।
দারিদ্র্য: এক জটিল বাস্তবতা
দারিদ্র্য মানে কেবল পকেটে টাকা না থাকা নয়। অনেক সময় সামান্য আয়ের মানুষেরাও স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, পরিষ্কার জল কিংবা বিদ্যুতের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। এ কারণে দারিদ্র্যকে গোলকধাঁধার মতো ধরা হয়, যেখানে অনেক দরজা বন্ধ থাকে এবং মানুষ সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
MPI সূচকের তিনটি প্রধান দিকের বিস্তারিত
শিক্ষা: এখানে স্কুলে উপস্থিতি এবং পড়াশোনার সময়কালকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য: পুষ্টি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত।
জীবনযাত্রার মান: বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, পানীয় জল, বাসস্থান, রান্নার জ্বালানি, সম্পদ এবং ইন্টারনেট সেবার সুবিধা বিচার করা হয়।
এই সব সূচকের মাধ্যমে মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান পরিমাপ করা হয়।
বহুমুখী দারিদ্র্যে বেশি শিকার শিশুরা
১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২৯ শতাংশ বহুমুখী দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। তবে ২০১২-১৩ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তখন অর্ধেক শিশু দারিদ্র্যের কবলে ছিল। এটির মানে প্রায় ১.৩ কোটি শিশু দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ, বাসস্থান, সম্পদ ও স্যানিটেশন উন্নতির ফলাফল।
শহর বনাম গ্রামের দারিদ্র্যের পার্থক্য
শহুরে এলাকায় বহুমুখী দারিদ্র্যের হার ১৩ শতাংশ, যা গ্রামীণ এলাকার ২৭ শতাংশের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এর কারণ হতে পারে শহরের উন্নত অবকাঠামো, সেবা ও সুযোগ-সুবিধার বেশি উপস্থিতি। তবে গ্রামীণ এলাকায় এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে রেখেছে।
বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্যের বৈষম্য
দেশের বিভিন্ন বিভাগে দারিদ্র্যের হার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। খুলনায় ১৫ শতাংশ মানুষ বহুমুখী দরিদ্র, যেখানে সিলেটে এই হার ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরে উন্নয়নের বৈষম্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
জেলা পর্যায়ে চরম বৈষম্য
MPI জরিপ মতে ঝিনাইদহ জেলায় মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র, কিন্তু বান্দরবানে এই হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছায়। কক্সবাজার ও সুনামগঞ্জেও প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবনযাত্রা বহুমুখী দারিদ্র্যের মধ্যে। এসব জেলা দেশের সবচেয়ে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।
বাসস্থান ও নীতিমালা
প্রায় ২১ শতাংশ মানুষের বাসস্থানে উন্নত মেঝে, ছাদ বা দেয়াল নেই, যা তাদের দারিদ্র্যের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, বাসস্থান ও স্যানিটেশন উন্নত করা, ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ানো এবং বিশেষ করে দারিদ্র্যের উচ্চ হার থাকা জেলা ও অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি। সরকারি ও সামাজিক সহায়তা কার্যকরভাবে প্রয়োগে দেশীয় দারিদ্র্য মোকাবেলায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।


