গত বছর বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন। ২০২৪ সালে মোট ১০,০৯,১৪৬ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা ২০২৩ সালের ১৩,৯০,৮১১ জন থেকে ২৭.৪ শতাংশ কম। “আমি প্রবাসী” নামক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক এবং পরবর্তী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এ পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা বৈদেশিক কর্মসংস্থানে স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। চাকরির নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মীকে বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছে।
২০২৪ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে অভিবাসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। জুন মাসে ৫৪,৭২৫ জন, জুলাইয়ে ৭১,০৮০ জন, আগস্টে ৫২,৮১৮ জন, এবং সেপ্টেম্বরে ৬৪,১৫৭ জন বিদেশে গেছেন। তবে অক্টোবর মাসে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১,০৪,৮১১ জনে পৌঁছে, এটি ডিসেম্বরে পর্যন্ত স্থিতিশীল ছিল। মোট অভিবাসন কমে গেলেও, ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেইনিং (বিএমইটি) রেজিস্ট্রেশনে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালে নারীদের রেজিস্ট্রেশনের হার ছিল ২.৭৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৪.৭৯ শতাংশ হয়েছে। “নারীদের জন্য জর্ডান বেশ জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে। গত বছর ১৩,০০০-এর বেশি নারী কর্মী, বিশেষত গার্মেন্টস শিল্পে কাজের জন্য সেখানে গিয়েছেন,” বলেন বাংলাট্র্যাক গ্রুপের ইনোভেশন বিভাগের প্রধান এম তানভীর সিদ্দিক।
২০২৪ সালে সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্য, যেখানে মোট অভিবাসনের ৬২.১৭শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬,২৭,০০০ জন কর্মী গেছেন। উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের উচ্চ চাহিদার কারণে সৌদি আরব অভিবাসীদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য মালয়েশিয়ায় অভিবাসন সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।২০২৪ সালে সেখানে মাত্র ৯৩,০০০ জন কর্মী গেছেন, যা মালয়েশিয়ার নতুন বিদেশি শ্রম নীতির পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। জেনারেল ট্রেইনিং এনরোলমেন্ট, যা দক্ষ কর্মী তৈরির একটি প্রধান সূচক, ২০২৩ সালের ২,৩৬,২৭০ জন থেকে ২০২৪ সালে ১,১২,১৬৬ জনে নেমে এসেছে, এটি কর্মসংস্থানের চাহিদা ও প্রস্তুতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
“নারীদের বিএমইটি রেজিস্ট্রেশনের বৃদ্ধির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে তারা বৈদেশিক কর্মসংস্থানে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন।উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তার মাধ্যমে আমরা আরও দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারবো,” বলেন আমি প্রবাসীর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক এ হক। ২০২৪ সালে বিএমইটি-তে মোট ৭,৯৮,২৭৬ জন নিবন্ধন করেছেন, যা ২০২৩ সালের ৬,৬০,০৮৮ জনের তুলনায় বেশি। যদিও পুরুষরাই এখনও অভিবাসন খাতে আধিপত্য বজায় রেখেছেন, তবে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে দক্ষ ও আধা-দক্ষ পেশায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। নারীরা এখন গৃহকর্মের পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণে ঝুঁকছেন, যেমন কম্পিউটার অপারেশন, গ্রাফিক ডিজাইন ও অটোক্যাড ড্রাফটিং। গত বছর ৭০০-এর বেশি নারী দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বিদেশে গেছেন।
২০২৪ সালে ঢাকা বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী বিদেশে গেছেন, যার সংখ্যা ২.৬৪ লাখ। এর পরে রয়েছে চট্টগ্রাম (২.৩১ লাখ), খুলনা (৭২,০০০) এবং রাজশাহী (৬৬,০০০)। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উন্নত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, লিঙ্গ-সমতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি শ্রম বাজারের সাথে আরও কার্যকর চুক্তি স্বাক্ষর করা হলে অভিবাসন খাত পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এটি দক্ষ কর্মী রপ্তানি বৃদ্ধি এবং টেকসই রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। বাংলাট্র্যাক গ্রুপের এম তানভীর সিদ্দিক অভিবাসী কর্মীদের জন্য “আমি প্রবাসী” প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা তুলে ধরেন যেখানে বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন, সার্টিফিকেট সংগ্রহ, রিব্রুটিং এজেন্সির সাথে সংযোগ এবং চাকরির অনুসন্ধানসহ নানা সুবিধা প্রদান করা হয়।


