“বন্দর বিষয়ে কয়েকটা কথা বলা যাক। বহু রকম আলোচনা আসছে এখানে, কিন্তু একটা দুশ্চিন্তার বিষয় হলো অন্তবর্তী সরকারের সমর্থকরা এই ক্ষেত্রে যতটা উগ্র আচরণ করছেন, ততটা তথ্য তারা জনগণকে দিচ্ছেন না।
আর একটা বিরক্তিকর দিক হলো, মানুষকে তথ্য জানতে হচ্ছে গণমাধ্যমে হৈচৈ দেখে, কিংবা অত্যন্ত আশাবাদী কিছু সমর্থকের ভালো ভালো আশাবাদ থেকে। বন্দরের বা বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধিতায়ও কখনো কখনো যে অত্যন্ত রূঢ় বা শক্ত কথা বলা যায়, তার জন্য সব আমলেই দায়ী সরকারের অস্বচ্ছতা, ঠিকমত তথ্য না দেয়া, জনগনের সাথে আলাপ না করা।
বর্তমান দুনিয়ার অত্যন্ত দ্রুতগতির অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ দরকার, তাতে সন্দেহ করার কিছু নাই। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, বন্দরের মত কোন কোন ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন, আমাদের প্রযুক্তির অভাব, ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা ও নগদ বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটাতে।
কিন্তু বন্দর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ, এবং এই বিষয়ে তাড়াহুড়োর কিছু নাই, এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতেই হবে। ফলে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ কোন মাত্রায়, কিসের ভিত্তিতে, সেটা নিয়ে একটা নীতিমালা আগে দরকার, বন্দর বিষয়ক যে কোন চুক্তির আগেই।
অন্যদিকে, কোন বিনিয়োগ ভালো, আর কোন বিনিয়োগ দেশের এমনকি সর্বনাশও করতে পারে, সেটাও বিবেচনায় রাখা দরকার। উৎপাদনী খাতে যখন বিনিয়োগ দেখবেন, খানিকটা হলেও নিশ্চিত হওয়া যাবে যে — এখানে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ও প্রযু্ক্তি ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞান বাড়াচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগটা যদি হয় লাভ প্রচুর এবং লাভ নিশ্চিত, সেখানে বিনিয়োগ আনাটা খুব বড় কোন কাজ নাও হতে পারে। কর্মসংস্থান এমনকি কমতেও পারে, জাতীয় স্বার্থের ক্ষতিও হতে পারে। এমন উদাহরণ বিশ্বজুড়ে অজস্র।
বাংলাদেশেই এর বহু উদহারণ আছে। বিদেশি বিনিয়োগটা একটা সময়ে ছিল গ্যাস উত্তোলনে। প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, বিদেশী কোম্পানি তাদের লাভের অংশ বুঝে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে গ্যাস উত্তোলন করে অনেকগুলো গ্যাসক্ষেত্রের কাঠামোগত ক্ষতি সাধন করেছে। খরচা বাঁচাতে গিয়ে সম্ভাবনা ময় গ্যাসক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, বিদেশী কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন উদাহরণও বাংলাদেশেই আছে। বন্দরে নিশ্চয়ই কেউ আগুন লাগাবে না। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ মানেই যে ভালো কিছু না, এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ নজরদারিটাই থাকা প্রয়োজন।
ভিয়েতনামের কথাই ধরা যাক। অনেকগুলো বিদেশী বন্দর ও টার্মিনাল দেশটিতে আছে। কিন্তু এখনও দেশটির বন্দরের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। তারা কেন বিদেশীদের বা বেসরকারী উদ্যোক্তাদের হাতে বন্দর দিয়েছে, সেটা খুব পরিস্কার। বন্দর বিদেশীদের দেয়ার সময়ে তাদের নীতি এটা ছিল না যে বিদেশীরা ভালো, বা বেসরকারীরা বেশি কার্যকর। তাদের উপলদ্ধি ছিল এই যে, দেশটির চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় বিনিয়োগ করা সরকারের পক্ষে তখন সম্ভব না বলেই বিদেশী/বেসরকারী মালিক লাগবে।
এরপরও ভিয়েতনাম আইন করেছিল বন্দর বা টার্মিনালের মালিকানার ৫০ ভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকবে। জানি না তারা এই আইন বদল করেছে কি না ।ভিয়েতনামের উৎপাদনের মাত্রা ও মানচিত্র উভয়ের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন, দেশটিতে অজস্র বন্দর সম্ভব ও প্রয়োজন। দেশটি সমুদ্রের দিকে উন্মুক্ত। প্রায় পুরোটা সমুদ্রতীর ধরেই সেখানে রাষ্ট্রটার উদ্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের সাথে ভিয়েতনামের মিলবে না। অন্যদিকে, পুরোপুরি সমুদ্রের মাঝে থাকা, এবং উৎপাদন না, বন্দরই প্রধান আয়ের উৎস এমন একটা দেশ হলো সিঙ্গাপুর। ওরা নিশ্চযই আরও বেশি বেশি করে বিদেশী মালিকানায় বন্দর ও টার্মিনাল বানিয়েছে? না। দুঃখজনক হলেও অতি সামান্য। সেগুলোতেও সরকারের বিপুল নিয়ন্ত্রণ।
কারণটাও মানচিত্রে ও বাস্তবতা ভাবনায় পাবেন। সিঙ্গাপুর ছোট দেশ। চারদিকে সমুদ্র হলেও ভূভাগ সীমিত। ষাটের দশক থেকে ওরা ক্রমাগত বন্দর বানিয়ে চলেছে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশের সাথে হয়তো সিঙ্গাপুরেরও মিলবে না, তবে উপকূলের সীমা ও বন্দর করার মত উপযুক্ত জায়গার কথা ভাবলে সেখান থেকে একটা বিষয় আমরা শিখতে পারি: জাতীয় সক্ষমতা বরং বাড়াতে হবে, বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ বিপদজনক হতে পারে।
অন্যদিকে আমাদের নতুন অধিকাংশ বন্দরের প্রকল্প গাড়ির আগে ঘোড়া জোড়ার মত। উৎপাদনের খবর নাই, কিন্তু বহু পরে যা ভাবলেও চলবে, তা নিয়েই আমাদের হুড়োহুড়ি।
কিন্তু নতুন বন্দরের প্রয়োজন নিয়ে ভাবলে আমরা যেন মুখস্ত করে বলে না দেই ভিয়েতনামের কথা। খুঁজলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নানান দেশে যত রকমের সমস্যা ও সম্ভাবনা তৈরি করে, তার আরো নানান ধরনের মাত্রা আমরা দেখতে পাবো : জিবুতির বাস্তবতা, পানামার বাস্তবতা, সুয়েজ খাল কিভাবে মিশরকে চিরস্থায়ী সেনাশাসনের দেশে পরিণত করলো সেই বাস্তবতা।
আমাদের খামাখা আতঙ্কগ্রস্ত হবার কিছু নাই যেমন, তেমনি শুধু টাকা গুনে বন্দরের লাভ ক্ষতির কথা বলা যায় না, বন্দর একটা গভীরভাবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়, সেটাও মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাতেই বন্দর নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। … বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের বন্দরের কার্যকারিতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। বন্দরের জট ছড়াতে হবে। বন্দরকে আমলাতন্ত্র মুক্ত করতে হবে।
সেটা করা হলে এখনই বন্দরের কার্যকারিতা তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব, সেটা অনেকবার পড়েছি বিশেষজ্ঞদের লেখায়। সেই উদ্যোগ আমরা কতখানি নিয়েছি? অন্তবর্তী সরকার যেখানে সঙ্গতকারণেই কৃতিত্ব দাবি করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক অনেকখানি কার্যকর করার, টলোমলো ব্যাঙ্ক খাতকে নিয়্নত্রণ করার, একই কারণে চাহিদা হলে, ঈমান ঠিক থাকলে বন্দরও ঠিক করতে পারে।
না পারলে সেই ব্যর্থতাও স্বীকার করুক জনগণের কাছে। কিন্তু না পারার কোন কারণ আমি দেখি না। ভবিষ্যতে আমাদের বন্দরের চাহিদা বাড়বে, এর সম্প্রসারণ ও নতুন বন্দরও লাগবে। ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর উভযের কাছ থেকেই শিক্ষা নিয়ে আমাদের উপযুক্ত একটা পথেও আমাদের যেতে হবে।
কিন্তু প্রধান বন্দর ও টার্মিনালগুলো– যেগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব আছে– অবশ্যই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় রাখতেই হবে। দেশের হাতে মূল মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের যে কোন ফারাক দেখা যায় না, তা অকারণ নয়। বন্দর শুধু টাকা গোণার বস্তু না– টাকাটা যদিও দরকার আছে– বন্দর জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা।”


