বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণ একটি ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ভারী ধাতু নিকেল, সিসা বা ক্যাডমিয়াম, মাটি ও পানিতে মিশে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। এমন এক সময়ে ফিলিপাইনের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন এক বিস্ময়কর উদ্ভিদ Rinorea niccolifera, যা অসাধারণভাবে উচ্চমাত্রায় নিকেল শোষণ করতে পারে। এই উদ্ভিদ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণে নয়, ধাতু আহরণ বা phyto-mining প্রযুক্তিতেও বিপ্লব আনতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবিষ্কারের পেছনের গল্প
Rinorea niccolifera উদ্ভিদটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ফিলিপাইনের লুজন (Luzon) দ্বীপে। দেশটির পরিবেশ-সংরক্ষণ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষকরা এই উদ্ভিদকে প্রথম শনাক্ত করেন ধাতু সমৃদ্ধ অঞ্চলের ঝোপজঙ্গলে। পরে গবেষণায় দেখা যায় এই উদ্ভিদটির পাতায় প্রতি কেজিতে ১৮,০০০ পার্টস পার মিলিয়ন (ppm) পর্যন্ত নিকেল জমা হতে পারে, যা সাধারণ উদ্ভিদের তুলনায় শতগুণ বেশি। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ফিলিপাইনের Mines and Geosciences Bureau এবং University of the Philippines-এর বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলেন, Rinorea niccolifera একটি হাইপারঅ্যাকিউমুলেটর উদ্ভিদ, অর্থাৎ এটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ধাতু শোষণ ও জমা করতে পারে, অথচ নিজের ক্ষতি করে না।
কীভাবে কাজ করে এই গাছ?
Rinorea niccolifera এর মূল, কান্ড ও পাতা মাটি থেকে নিকেল শোষণ করে। এই ধাতুটি সাধারণত গাছের জন্য বিষাক্ত হলেও, এই উদ্ভিদটির শরীরে একধরনের জৈব রাসায়নিক প্রতিরক্ষা রয়েছে যা নিকেলের বিষক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এর ফলে গাছটি সহজেই উচ্চমাত্রার নিকেল নিজের শরীরে জমা করতে পারে এবং বেঁচে থাকতে পারে।
এই উদ্ভিদের আবিষ্কার phytoremediation-এর জন্য একটি বড় আশা জাগিয়েছে। Phytoremediation এমন একটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, যেখানে গাছ ব্যবহার করে দূষিত মাটি বা পানিকে বিশুদ্ধ করা হয়। Rinorea niccolifera দূষিত মাটি থেকে নিকেল শোষণ করে মাটিকে নিরাপদ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল বা খনিচালিত অঞ্চলে এই গাছ ব্যবহার করে মাটির ধাতু দূষণ দূর করা সম্ভব। অন্যদিকে এই গাছ ব্যবহার করে phyto-mining অর্থাৎ উদ্ভিদ-ভিত্তিক খনিজ আহরণও সম্ভব হতে পারে। এই পদ্ধতিতে গাছগুলো ধাতু শোষণ করে জমা রাখে, পরে এগুলো সংগ্রহ করে ধাতুটি আলাদা করা হয়। এটি প্রচলিত খননপদ্ধতির তুলনায় সস্তা, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব।
উদ্ভিদটি এখনো কেবল পরীক্ষাগারে এবং স্থানীয় অঞ্চলে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, বড় পরিসরে ব্যবহারের জন্য এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, Rinorea niccolifera ধীরে বাড়ে এবং এর অভিযোজন ক্ষমতা এখনো বিশেষ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ। ফলে, একে বিভিন্ন ধরনের মাটিতে ব্যবহারযোগ্য করতে জেনেটিক রূপান্তর বা সংকরায়ণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে গবেষকরা আশাবাদী। তাঁদের মতে সঠিক পরিকল্পনা, কৃষি-প্রযুক্তি ও পরিবেশ-বান্ধব নীতির মাধ্যমে এই উদ্ভিদ ভবিষ্যতে দূষণ-নিয়ন্ত্রণ এবং খনিজ আহরণ দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।


