২০২৪ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড (WEWB) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ৪,৮১৩টি মৃতদেহ দেশে ফেরত এসেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ২৬১টি বেশি। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪,৫৫২টি।
এই প্রবণতা ২০২১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। ২০২১ সালে দেশে ফিরেছিল ৩,৮১৮টি মৃতদেহ এবং ২০২২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,৯০৪টিতে। এসব মৃতদেহ মূলত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। WEWB জানিয়েছে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ৫৬,৭৬৯টি প্রবাসী মৃতদেহ দেশে ফেরত এসেছে।
এমন পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে। প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু বাস্তবতা অনেকের জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং অনেকেই তরুণ বয়সে লাশ হয়ে ফিরে আসেন।
এই মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ এখনও পরিষ্কার নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা হৃদ্রোগকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যাখ্যা প্রায়ই যথাযথ নয় এবং আরও গভীরভাবে চিকিৎসা পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
ওয়ার্বি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক জাসিয়া খাতুন বলেন, “অকালমৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, দুর্বল আবাসন ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক শ্রমিক ঋণের বোঝা নিয়ে বিদেশে যান এবং সেই অর্থ ফেরত আনার জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করেন, ঠিকমতো খাবারও গ্রহণ করেন না।”
তিনি আরও বলেন, শুধু হার্ট অ্যাটাক বলেই দায় শেষ করা ঠিক নয়। এই মৃত্যুর পেছনে তীব্র গরম, দূষণ, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগ যেমন কিডনি সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখে।
জুলাই ২০১৬ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত WEWB-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে বাংলাদেশে ১৭,৮৭১টি মৃতদেহ ফেরত আসে, যার মধ্যে ৬৭.৪ শতাংশই আসে ছয়টি গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) দেশ থেকে। এই দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫,৬৬৬টি মৃতদেহ আসে সৌদি আরব থেকে। এরপর ১,৯১৩টি সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ১,৮৯৩টি আসে ওমান থেকে। বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১.৬ কোটি কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার মধ্যে ৭৬.৩ শতাংশ GCC দেশগুলোতে গেছেন।
২০২২ সালে প্রকাশিত Vital Signs Partnership (VSP)-এর “The Deaths of Migrants in the Gulf” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গালফ অঞ্চলে কর্মরত নিম্ন বেতনভুক্ত শ্রমিকরা তীব্র গরম, উচ্চ আর্দ্রতা, দূষণ, অমানবিক কর্মপরিস্থিতি ও মানসিক চাপে ভোগেন। এসব পরিস্থিতি তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায় এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
জাসিয়া খাতুন পরামর্শ দেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করতে হবে যেন বিদেশে প্রবাসীদের জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
WEWB একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ। আমরা বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী পাঠানোর হার বেড়েছে, এটা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।”
WEWB প্রত্যেক মৃতদেহ ফেরতের জন্য দাফন ও পরিবহনের খরচ হিসেবে ৩৫ হাজার টাকা এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩ লাখ টাকা প্রদান করে থাকে।
প্রবাসীদের স্বপ্ন যেন আর কফিনে বন্দি না হয় তার জন্য শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, প্রয়োজন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, প্রয়োজনে পুনরায় ময়নাতদন্ত, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যথাযথ মনিটরিং ব্যবস্থা।


