প্যারাসাইকোলজি মনের গোপন শক্তি ও অতীন্দ্রিয় রহস্যের সন্ধানে !

প্যারাসাইকোলজি এক বিশেষ শাখার অধ্যয়ন, যেখানে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও মানব চেতনার আড়ালে থাকা অপ্রচলিত দিক সমূহ নিয়ে গবেষণা করা হয়। এখানে আক্ষরিক পরিচয়ে বলতে গেলে টেলিপ্যাথি, টেলিকিনেসিস, প্রাকজ্ঞা (প্রিকগনিশন), এবং অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি (ESP) নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে। প্যারাসাইকোলজির ধারণা বহু প্রাচীন। প্রাচীন ভারত, চীন ও গ্রিসে অতীন্দ্রিয় শক্তির কথা বলা হয়েছে। হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মে সাধকদের অলৌকিক ক্ষমতার অনেক বিচিত্র উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেককাল আগে প্লেটো এবং সক্রেতিসও চেতনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

আধুনিক প্যারাসাইকোলজির সূচনা ঘটে ১৮৮২ সালে লন্ডনের সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ (SPR) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৩০-এর দশকে ড. জে. বি. রাইন ডিউক ইউনিভার্সিটিতে অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি (ESP) ও টেলিকিনেসিস নিয়ে গবেষণা করেন। উল্লেখ আছে ১৯৭০ সালে স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA “স্টারগেট প্রোজেক্ট” পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে মানসিক শক্তি দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির গবেষণা করা হতো। প্যারাসাইকোলজির অনেক শাখা ও উদাহরণ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু, যেমন-
টেলিপ্যাথি বাংলায় যার অর্থ চিন্তা বিনিময়ের – অতিপ্রাকৃত পদ্ধতি।

অ্যাপোলো ১৪ মিশনের সময়, ১৯৭১ সালে, মার্কিন নভোচারী এডগার মিচেল চাঁদ থেকে এক গোপন টেলিপ্যাথি পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তিনি চাঁদ থেকে পৃথিবীতে মানসিকভাবে সংকেত পাঠানোর চেষ্টা করেন, যা ছিল প্যারাসাইকোলজির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জানা গেছে মিচেল পূর্বপরিকল্পিতভাবে চারজন স্বেচ্ছাসেবকের (রিসিভার) একটি দলকে যুক্ত করেছিলেন, যারা পৃথিবীতে থেকে সংকেত গ্রহণের চেষ্টা করছিলেন। পরীক্ষার জন্য তিনি ২৫টি এলোমেলো সংখ্যার তালিকা তৈরি করেন, যেগুলো পাঁচটি প্রতীকের একেকটি গ্রুপ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করছিল (যেমন: তারা, ঢেউ, বৃত্ত ইত্যাদি)।

চাঁদ থেকে প্রতিবার তিনি এলোমেলোভাবে প্রতীক নির্বাচন করে তা পৃথিবীতে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেন শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে, কোনো যান্ত্রিক যোগাযোগ ছাড়াই! পৃথিবীর গ্রহণকারীরা তাদের অনুভূত সংকেতগুলো নোট করেছিলেন এবং যেগুলো পরে মিচেলের পাঠানো সংকেতগুলোর সাথে তুলনা করা হয়। ফলাফল ও প্রতিক্রিয়ার কথা বলতে গেলে পরীক্ষাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নাসার অনুমোদিত ছিল না, এটি সম্পূর্ণ মিচেলের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল। পরীক্ষার ফলাফল কিছুটা মিশ্র ছিল, তবে মজার ব্যাপার ছিলো, তাদের দাবী, পরিসংখ্যানগতভাবে সাধারণ অনুমানের চেয়ে কিছুটা ভালো ফলাফল তারা পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা একে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ না করলেও প্যারাসাইকোলজিতে আগ্রহীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এডগার মিচেল এই পরীক্ষার পর এতই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, প্যারাসাইকোলজি ও চেতনার শক্তি ও অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির ওপর বিশদ গবেষণা চালানোর জন্য “ইনস্টিটিউট অব নোএটিক সায়েন্সেস” প্রতিষ্ঠা করেন। এরকম আর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে , ১৯৭০-এর দশকে নিনা কুলাগিনা নামের এক রাশিয়ান নারী দাবি করেন যে তিনি শুধুমাত্র টেলিকিনেসিসের (মনোযোগ দিয়ে) সাহায্যে যে কোনো বস্তু সরাতে পারেন। ভারতে ড. ইয়ান স্টিভেনসন ৩,০০০-এর বেশি পুনর্জন্মের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছেন, যেখানে শিশুরা তাদের পূর্বজন্মের স্মৃতি বর্ণনা করেছে !

এগুলোর মধ্যে আরেকটি ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে প্রাকজ্ঞা (প্রিকগনিশন), বা ভবিষ্যতের ঘটনা পূর্বানুমান করার ক্ষমতা। মার্কিন মনস্তাত্ত্বিক ড. ডিন র‍্যাডিন ESP নিয়ে গবেষণা করেন এবং দাবি করেন যে কিছু মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অস্পষ্ট সংকেত পেতে পারে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এমন ছবি দেখানো হয়, যেগুলো ছিলো হয় ভয়ঙ্কর নতুবা প্রশান্তিদায়ক। ছবি দেখানোর আগেই তাঁদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া (হৃদস্পন্দন, ত্বকের পরিবাহিতা) মাপা হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে, অংশগ্রহণকারীরা ছবি দেখার আগেই কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখান, বিশেষ করে যদি ছবি ভয়ঙ্কর হয়।

অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলো শব্দ বা ছবি অনুমান করতে বলা হয়, যা পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার র‍্যান্ডমলি নির্বাচন করবে। ফলাফলে দেখা গেছে, কিছু মানুষ অনুমানের ক্ষেত্রে গড়ের চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স করে, যা ESP-এর প্রকট সম্ভাবনাকেই ইঙ্গিত দেয়। পরে ড. ডিন র যাডিন তাঁর গবেষণাগুলোকে “Entangled Minds” এবং “The Conscious Universe” বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন প্যারাসাইকোলজি নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক অনেক। বিজ্ঞানীরা প্যারাসাইকোলজিকে ছদ্মবিজ্ঞান মনে করেন, কারণ একে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা কঠিন। তারা বিশ্বাস করেন এই সংক্রান্ত গবেষণা বা পরীক্ষাগুলোর ফলাফল যথেষ্ট পুনরাবৃত্তিযোগ্য নয় এবং এসব প্লেসিবো বা এলোমেলো সম্ভাবনার কারণে ঘটতে পারে।

তবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং চেতনার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা কিছু বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কের কিছু কার্যপ্রক্রিয়া এখনো বিজ্ঞানের পরিধির বাইরে রয়ে গেছে, ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান নিজেই হয়তো এর বিশেষ কোনো ব্যাখ্যা দেবে। যদিও প্যারাসাইকোলজি বিতর্কিত, তবে এটি মানব মনের অজানা শক্তি সম্পর্কে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক গবেষণার ক্ষেত্র বলে দাবী রয়েছে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন