“Without music, life would be a mistake.” – Friedrich Nietzsche”
কেন আমরা সঙ্গীত শুনি? কেন গান আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়, আর চলচ্চিত্রে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক না থাকলে দৃশ্যগুলো ফাঁপা লাগে? মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিংকার বলবেন, এসব নিছক বিলাসিতা। কিন্তু নিট্শে বলেন “সঙ্গীত ছাড়া জীবন ভুল” এমন ভুল যা আমাদের মানবতাকে বিলীন করে ফেলত। আমরা জানবো, কেন ফ্রিডরিখ নিট্শে মনে করেন সঙ্গীত ভাষার ভিত্তি, আর কেন স্টিভেন পিংকারের মতো আধুনিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এই ধারণার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।
স্টিভেন পিংকার সঙ্গীতকে বলেন “auditory cheesecake” একটা উপভোগ্য কিছু, কিন্তু জীবনের জন্য অপরিহার্য নয়। ভাষা, সামাজিক বিবেচনা, বা দৃষ্টির মতো মৌলিক কিছু নয় সঙ্গীত, বরং এটি বিবর্তনের একটি ‘spandrel’, যা মূল বিবর্তনগত সুবিধার পাশে জন্ম নেওয়া এক প্রকার ‘উপ-পণ্য’।পিংকারের মতে, সঙ্গীত হারিয়ে গেলেও মানবজীবনের চালচলনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।
এক্ষেত্রে নিট্শের ধারণা একেবারেই ভিন্ন। তিনি বলেন, ভাষার অস্তিত্বই নির্ভর করে সঙ্গীতের উপর। মানুষের ভাষায় যে সুর, ছন্দ, ভঙ্গি তা ছাড়া শব্দ কেবল নির্জীব প্রতীকমাত্র। ভাষার আবেগগত ও অভিব্যক্তিমূলক দিক এসেছে সেই ‘সঙ্গীতধর্মী উপস্তর’ (tonal subsoil) থেকে।
ভাষার জন্ম কি সঙ্গীতের গর্ভে?
নিট্শে তার অপ্রকাশিত নোটবুকে ভাষার দুটি উপাদানের কথা বলেন,
১. টোন বা ছন্দ (prosody) – বাক্যের সুর, ওঠানামা, আবেগ
২. ইঙ্গিতমূলক অঙ্গভঙ্গি (gesture-symbolism) – ধ্বনির মাধ্যমে তৈরি প্রতীক যা মুখমণ্ডলের অঙ্গের অবস্থান থেকে গঠিত হয়।
এই দুইয়ের মধ্যে নিট্শে মনে করেন, টোন বা সঙ্গীতধর্মী উপাদানই ভাষার ভিত্তি। শব্দ অর্থ বহন করে এই কারণে যে, আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার আবেগিক স্তর যেমন আনন্দ, কষ্ট, ভয় সুর ও ছন্দের মাধ্যমে বুঝতে পারি। ভাষার প্রতীক তখনই অর্থবহ হয়, যখন আমাদের অভ্যন্তরীণ জগতে তা কোনো অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায়।
সঙ্গীত না থাকলে ভাষা থাকত না?
নিট্শে মনে করেন, ভাষা কোনো একক ব্যক্তি আবিষ্কার করেনি। বরং এটি ছিল গোষ্ঠীগত অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয়। প্রাগৈতিহাসিক মানব সমাজে ভাষা ছিল ঝুঁকির সংকেত দেওয়ার একটি পদ্ধতি—যেমন শিকার আসছে, বা আগুন লেগেছে। এই ভাষা ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন ছিল সচেতনতা, এবং সেই সচেতনতা জন্মায় যখন আমরা বুঝি অন্যরাও আমাদের মতো অনুভব করতে পারে। এই পারস্পরিক অনুভবের তাৎক্ষণিক সংযোগ তৈরি করেছিল নানা সঙ্গীতধর্মী টোন, যা পরে গড়ে তোলে ভাষাকে।
নিট্শে তার প্রথম বই The Birth of Tragedy-এ সঙ্গীতের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন শোপেনহাওয়ারের প্রভাবিত দর্শনে। শোপেনহাওয়ার বলেন, সঙ্গীত আমাদের ইচ্ছাশক্তি বা “will”-এর সরাসরি প্রতিচ্ছবি। আর্ট অন্য যেকোনো মাধ্যম যেখানে ‘বিশ্বজনীন ধরণে’ কিছু প্রকাশ করা হয়, সেখানে সঙ্গীত আমাদের ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়ে একটি মৌলিক অস্তিত্বের ছোঁয়া দেয়। শোপেনহাওয়ারের মতে, সঙ্গীত প্রকাশ করে আবেগের সারাংশ, নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে আবদ্ধ আবেগ নয়। গান বলতে পারে দুঃখ—কিন্তু এমন দুঃখ যা নির্দিষ্ট কোনো স্মৃতির নয়, বরং দুঃখ নিজেই।
গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলোতে নাট্যপাত্ররা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি ছিল কোরাসের গাওয়া গান। এই সঙ্গীতই ছিল দর্শকদের আবেগ-সংক্রমণের প্রধান উৎস। তারা শুধু গল্প দেখেনি, তারা সঙ্গীতের মাধ্যমে নিজেকে তার অংশ ভেবেছে। নাটক ছিল আত্মদর্শনের এক সম্মিলিত উৎসব। ব্যক্তিগত উদ্বেগ ছাপিয়ে দর্শক এক বৃহত্তর জীবনের স্রোতে বিলীন হতে পেরেছে, এটি সঙ্গীত ছাড়া সম্ভব হতো না।
বর্তমান সময়ে নিট্শের যুক্তিকে আমরা সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, বা গানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের মধ্যে প্রতিফলিত দেখতে পাই। নিট্শে হয়তো অতিরিক্ত রোমান্টিক ছিলেন, কিন্তু তার এই থিসিস আমাদের শেখায় মানুষ শুধু কথায় কথা বোঝে না, বরং কণ্ঠের সুর, ছন্দ, থেমে যাওয়ার ভঙ্গি থেকেও অর্থ গ্রহণ করে।
স্টিভেন পিংকার হয়তো সঙ্গীতকে গার্হস্থ্য ভোজনের চিজকেক বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু নিট্শে বলছেন এটা আমাদের ভাষার প্রাণ এবং তার চেয়েও বড় কথা, মানবতার অনুভব। আমরা কথা বলি কারণ আমরা একে অপরকে অনুভব করি। আর এই অনুভবের প্রথম মাধ্যম হলো সঙ্গীত। সুতরাং নিট্শের সেই বহুলউদ্ধৃত উক্তি কেবল রোমান্টিক নয়, এটি এক গভীর দার্শনিক সত্য।


