মানব ইতিহাসে নূহের নৌকার কাহিনি এমন এক গল্প যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে মুগ্ধ করেছে। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে বর্ণিত এই ঘটনার সারকথা হলো মানুষের পাপাচারে ঈশ্বর এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তিনি পৃথিবীকে এক মহাপ্লাবনে ডুবিয়ে দেন। কিন্তু এক ব্যতিক্রম ঘটেছিল নূহ নামের ধার্মিক মানুষ ও তার পরিবার, সঙ্গে প্রতিটি প্রাণীর জোড়া, এক বিশাল কাঠের নৌকায় চড়ে বেঁচে যায়।
এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক আলোচনারও অংশ । প্রশ্ন জাগে এই নৌকা সত্যিই কোথাও ছিল? আর যদি থেকে থাকে, তবে কেন এটি খুঁজে পাওয়া যায়নি?
নূহের প্লাবনের কাহিনি অনন্য নয়। বাইবেলের আগেই প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সাহিত্যে মহাপ্লাবনের গল্প পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দিককার রচনা গিলগামেশ মহাকাব্যেও এক বিধ্বংসী বন্যা ও তার থেকে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। আবার ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক ব্যাবিলনীয় কিউনিফর্ম ট্যাবলেটে নৌকা তৈরির নির্দেশনা পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ প্লাবনের গল্প আসলে বহু সভ্যতায় বিদ্যমান। গবেষক এরিক ক্লাইন মনে করিয়ে দেন, প্রায় ৭,৫০০ বছর আগে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে এক বৃহৎ বন্যার ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে। তবে ইতিহাসবিদরা একমত নন যে সেই বন্যাই নূহের কাহিনির মূল। সম্ভবত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতাই মানুষের মৌখিক ও লিখিত কাহিনিতে মহাপ্লাবনের রূপ পেয়েছে।
বাইবেলের জেনেসিস গ্রন্থে বলা হয়েছে, নৌকাটি “আরারাত পর্বতের উপর” থেমে গিয়েছিল। প্রাচীন উরার্তু রাজ্যের এই অঞ্চল আজকের আর্মেনিয়া, পূর্ব তুরস্ক ও ইরানের অংশ। তবে সমস্যা হলো আরারাত বলতে একক পর্বত নয়, একাধিক পর্বতমালাকে বোঝানো হয়েছে। ফলে নৌকাটি ঠিক কোথায় থেমেছিল তা নির্দিষ্টভাবে বলা অসম্ভব।
তারপরও ১৯ শতকের শেষ থেকে বহুবার আরারাত পর্বতে অনুসন্ধান হয়েছে। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ আইনজীবী ও রাজনীতিক জেমস ব্রাইস সেখানে গিয়ে এক টুকরো কাঠ সংগ্রহ করেন, দাবি করেন সেটিই নূহের নৌকার অংশ। আধুনিক সময়েও বারবার “নূহের নৌকা পাওয়া গেছে” ধরনের খবর শোনা যায়। সর্বশেষ একদল গবেষক দাবি করেছে, পূর্ব তুরস্কের দুরুপিনার নামের নৌকা-আকৃতির ভূখণ্ডে জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে। তবে ভূতত্ত্ববিদরা বলেন, সেটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শিলাস্তর, মানুষের তৈরি নৌকা নয়।
কেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা সংশয়ী?
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা এসব অনুসন্ধানকে মূলত ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব বলে মনে করেন। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার অধ্যাপক জোডি ম্যাগনেস স্পষ্ট করে বলেন, “কোনও প্রকৃত প্রত্নতত্ত্ববিদ নূহের নৌকা খুঁজতে যান না। প্রত্নতত্ত্ব মানে গুপ্তধন খোঁজা নয়; এটি এক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।”
অর্থাৎ প্রত্নতত্ত্বের লক্ষ্য নির্দিষ্ট বস্তু খুঁজে পাওয়া নয়; বরং খননের মাধ্যমে সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। নূহের নৌকার অনুসন্ধান নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে এবং প্রকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের গুরুত্বকে আড়াল করে দেয়।
বাইবেলের হিসাবে, এই নৌকা প্রায় ৪,৩০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। কাঠ দিয়ে তৈরি কোনও জাহাজ হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিছু ধর্মীয় গবেষক, যেমন Answers in Genesis সংস্থার বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু স্নেলিং মনে করেন নৌকাটি বন্যার পর ভেঙে ফেলা হয়েছিল। নূহ ও তার পরিবার আশ্রয় তৈরির জন্য কাঠ ব্যবহার করেছিল, ফলে আসল নৌকা আর অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। “আরারাত” নামটিও অস্পষ্ট, এটি আর আজকের নির্দিষ্ট মাউন্ট আরারাত নয়। তাই সঠিক স্থানের খোঁজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনকি কোনও কাঠ বা নিদর্শন পাওয়া গেলেও, তা যে নূহের নৌকা—এরকম প্রমাণ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে একটি প্রাচীন শিলালিপি বা স্পষ্ট প্রমাণ, যা নূহের নাম বা ঘটনার উল্লেখ করবে। কিন্তু এমন প্রমাণ আজও নেই।
যারা বাইবেলের বর্ণনাকে সরাসরি সত্য মনে করেন, তাদের কাছে নৌকা খোঁজার অভিযান আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে। অনেক সময় তারা বৈজ্ঞানিক প্রমাণকেও নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করেন বা অস্বীকার করেন। অপরদিকে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এমন অনুসন্ধান মূলত ভ্রান্ত প্রত্যাশা তৈরি করে।
জোডি ম্যাগনেসের মতে, বাইবেলের জগত নিজেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় যেমন দাউদের রাজবংশের প্রমাণ বা প্রাচীন গ্যালিলির সভ্যতা। এগুলো বাস্তব ইতিহাসের অংশ। অথচ নূহের নৌকা খোঁজার মতো প্রচেষ্টা প্রকৃত ইতিহাসচর্চার গুরুত্বকে ক্ষুণ্ণ করে।
এখানে মূলত দুটি শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত মানুষ অতীত সম্পর্কে রোমান্টিক কল্পনা করতে ভালোবাসে। নূহের নৌকার গল্প বিশ্বাসীদের কাছে আশা, বাঁচার বার্তা আর ঈশ্বরের ক্ষমার প্রতীক। তাই এর বাস্তব প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছা সহজবোধ্য।
প্রত্নতত্ত্ব আমাদের শেখায় ইতিহাস আবিষ্কার ধীর, জটিল এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ঘটে। একদিকে নূহের নৌকার অনুসন্ধান হয়তো রোমাঞ্চকর, কিন্তু অন্যদিকে টেল কাব্রির মতো কোনও প্রাচীন প্রাসাদ খনন আমাদের বাস্তব ইতিহাসের অসাধারণ তথ্য দেয় যা সভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতির বিনিময় বোঝায়।
“নূহের নৌকা কোথায়?”—এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। ইতিহাসবিদরা বলেন, নৌকার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এটি টিকে থাকার মতোই অসম্ভব। এমনকি যদি কাঠের কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়ও, তা নিশ্চিতভাবে নূহের নৌকা প্রমাণ করা যাবে না। তবে এই আলোচনাই দেখায় কল্পকথা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ইতিহাসের মধ্যে কীভাবে জটিল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নূহের নৌকা হয়তো কখনও পাওয়া যাবে না, কিন্তু এই গল্প মানব সংস্কৃতি ও কল্পনার অংশ হয়ে চিরকাল টিকে থাকবে।


