নিজেকে দেখার ফাঁদ

আমাদের ভেতরের জগৎটা কি সত্যি সত্যিই আমাদের আয়ত্তে? আমরা কি আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আর ইচ্ছাগুলোকে ঠিক সেভাবেই দেখি, যেভাবে তারা আসলে আছে? নাকি আমাদের মনের ভেতরে এমন কিছু আছে যা আমাদের আত্ম-উপলব্ধিকে (self-perception) ভুল পথে চালিত করে? এই প্রশ্নগুলো হাজার বছর ধরে দার্শনিকদের ভাবিয়েছে, আর আধুনিক যুগে এসে মানসিক স্বাস্থ্যের গবেষণাও এই একই রহস্যের সমাধান খুঁজতে ব্যস্ত। বিশেষ করে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা OCD-র মতো জটিল মানসিক অবস্থা এই প্রশ্নের গভীরে ডুব দেওয়ার একটা অনন্য সুযোগ করে দেয়। কীভাবে দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের এই দুটি ক্ষেত্র একে অপরের সাথে মিলেমিশে আমাদের “আত্মসত্তার” (selfhood) রহস্য উন্মোচন করতে পারে!

দর্শনের ইতিহাসে ‘আত্ম’ বা ‘স্ব’ বা self নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। বুদ্ধ দর্শনে বলা হয়েছে, “আত্মা” বলে কোনো স্থায়ী সত্তা নেই, যা আছে তা হলো অবিরাম পরিবর্তনের সমষ্টি। এটি আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আর অভিজ্ঞতার একটি স্রোত, যা প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দর্শনে ডেভিড হিউম বলেছিলেন তিনি যখন নিজের ভেতরে তাকান, তখন তিনি কোনো “আত্মা” খুঁজে পান না, বরং দেখতে পান কিছু অনুভূতির এক গুচ্ছ (a bundle of perceptions)। এই দর্শন অনুযায়ী, আমাদের ভেতরের জগৎকে দেখা বা “পর্যবেক্ষণ” করা এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া।

তবে এই পর্যবেক্ষণে আমরা কতটুকু নিরপেক্ষ? এখানেই চলে আসে আত্ম-ভ্রান্তির ধারণা। আমরা প্রায়শই নিজেদের সম্পর্কে এমন কিছু বিশ্বাস করি যা হয়তো বাস্তব নয়। যেমন আমরা নিজেদেরকে যতটা ভালো মনে করি, হয়তো ততটা ভালো আমরা নই; কিংবা আমরা নিজেদেরকে যতটা খারাপ ভাবি, হয়তো ততটা খারাপও আমরা নই। এই ভুল ধারণাগুলো তৈরি হয় আমাদের মনের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল (defense mechanisms), আবেগ এবং সামাজিক চাপের কারণে। এটি এক ধরনের মানসিক আড়াল, যা আমাদের বাস্তবতাকে ভুলভাবে দেখতে সাহায্য করে। এই আত্ম-ভ্রান্তি আমাদের নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু একই সাথে আমাদের প্রকৃত আত্ম-সত্তার পরিচয়কেও অস্পষ্ট করে তোলে।

OCD-র মূল লক্ষণগুলো হলো অবসেসিভ চিন্তা (obsessions) এবং কম্পালসিভ আচরণ (compulsions)। অবসেসিভ চিন্তাগুলো হলো অনাকাঙ্ক্ষিত, বারবার আসা কিছু চিন্তা, ছবি বা তাড়না, যা ব্যক্তির মনে প্রচণ্ড উদ্বেগ বা ভয় তৈরি করে। যেমন, “আমি কি কাউকে ক্ষতি করব?”, “আমার হাত কি জীবাণুযুক্ত?”। এই চিন্তাগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য ব্যক্তি কিছু নির্দিষ্ট আচরণ বা মানসিক ক্রিয়া করে, যাকে কম্পালসিভ আচরণ বলা হয়, যেমন বারবার হাত ধোয়া, জিনিসপত্র গোছানো বা মনে মনে কিছু বাক্য পুনরাবৃত্তি করা।

একজন OCD আক্রান্ত ব্যক্তি তার নিজের মনের ভেতরে ঘটে চলা এই অবসেসিভ চিন্তার প্রক্রিয়াকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সে বুঝতে পারে যে এই চিন্তাগুলো অযৌক্তিক, তবুও সে সেগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। এখানেই তার আত্ম-পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। সে তার মনের প্রতিটি গতিবিধি, প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাকে আক্ষরিক অর্থেই স্ক্যান করে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমি কেন এমন ভাবছি? এটা কি আমারই মনের কথা নাকি অন্য কিছু?” এই তীব্র পর্যবেক্ষণ এক ধরনের অতিরিক্ত সচেতনতা (hyper-awareness) তৈরি করে। এটি সেই পর্যবেক্ষণ যা একজন সুস্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সাধারণত থাকে না।

কিন্তু এখানেই ঘটে আসল গোলমাল। এই তীব্র পর্যবেক্ষণের মধ্যেই জন্ম নেয় আত্ম-ভ্রান্তি। OCD-র কারণে ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাগুলো তার প্রকৃত ইচ্ছা বা তার চরিত্রের প্রতিফলন।

যদি একজন ব্যক্তির মনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার প্রিয়জনকে আঘাত করার চিন্তা আসে, সে ভয় পেয়ে যায় যে হয়তো সে সত্যিই তার প্রিয়জনকে আঘাত করতে চায়। যদিও বাস্তবে তার এই ধরনের কোনো ইচ্ছা নেই। এখানে তার স্ব-উপলব্ধি বা self-perception বিকৃত হয়ে যায়। সে তার অনিচ্ছাকৃত চিন্তাকে নিজের ইচ্ছাকৃত চিন্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। এই ভ্রান্তির কারণে তার মধ্যে অপরাধবোধ, লজ্জা, আর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হয়। সে নিজের মনের ভেতরে এমন এক সত্তাকে দেখতে পায়, যা সে আসলে নয়।

OCD-তে আত্ম-ভ্রান্তি দুটি প্রধান উপায়ে কাজ করে। চিন্তা-ক্রিয়া সংমিশ্রণ (Thought-action fusion), এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন OCD আক্রান্ত ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে কোনো একটি খারাপ চিন্তা মনে আসা আর সেই খারাপ কাজটা বাস্তবে করে ফেলার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা ভাবে, “যদি আমি এমনটা ভাবি, তাহলে হয়তো আমি তা করবও।” এই বিশ্বাসটাই তাদের আত্ম-ভ্রান্তি তৈরি করে এবং কম্পালসিভ আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। তারা মনে করে কম্পালসিভ আচরণগুলো করে তারা ওই খারাপ কাজটা হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করছে, যা আসলে একটি ভ্রান্ত ধারণা।

তারপর আসে নৈতিক আত্ম-ভ্রান্তি (Moral self-deception), OCD আক্রান্ত ব্যক্তি তার অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাগুলোকে তার নৈতিক চরিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেয়। যেমন, যদি তার মনে কোনো ধর্মীয় অবসেসন (scrupulosity) আসে, তাহলে সে নিজেকে একজন খারাপ বা পাপী মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। সে মনে করে তার নৈতিক দিকটা দুর্বল, অথচ এই চিন্তাগুলো তার ইচ্ছাকৃত নয়। এই ধরনের ভ্রান্তি তাকে তার প্রকৃত নৈতিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

OCD-র চিকিৎসা, যেমন কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন (ERP), মূলত এই আত্ম-ভ্রান্তি ভেঙে দেওয়ার ওপর জোর দেয়। থেরাপির লক্ষ্য হলো ব্যক্তিকে বোঝানো যে তার চিন্তাগুলো কেবলই চিন্তা, সেগুলো তার প্রকৃত সত্তা বা ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। এখানে দর্শনের ধারণাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

চিন্তা এবং সত্তার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ব্যক্তিকে শেখানো হয় “আমি আমার চিন্তা নই”। এই ধারণাটি বুদ্ধ দর্শনের “অনাত্মা” (Anatta) বা হিউমের “মনের গুচ্ছ” ধারণার মতোই। এটা ব্যক্তি-কে তার মনের মধ্যে আসা অযৌক্তিক চিন্তা থেকে নিজেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। এই বিচ্ছিন্নতা তাকে তার অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কম্পালসিভ আচরণ করা থেকে বিরত রাখে।

ERP থেরাপিতে ব্যক্তিকে কম্পালসিভ আচরণ না করে তার ভয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এটি তাকে তার ভ্রান্ত ধারণাগুলো যেমন, “আমি এতবার হাত না ধুলে অসুস্থ হয়ে যাব” ভেঙে দিতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে বুঝতে পারে যে তার ভয়টি ছিল অমূলক এবং তার চিন্তাগুলো বাস্তবে কোনো খারাপ ফল নিয়ে আসে না। এটি তাকে তার আত্ম-ভ্রান্তির দেয়াল ভেঙে দিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।

OCD এবং দর্শনের মেলবন্ধন আমাদের আত্মসত্তার রহস্য নিয়ে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এটি কেবল একটি মানসিক রোগ নয়, বরং মানুষের মনের ভেতরের জটিল প্রক্রিয়াকে বোঝার এক উপায়। আমাদের শেখায় আমরা আমাদের নিজেদেরকে যেভাবে দেখি, তা সবসময় নিরপেক্ষ বা সঠিক নাও হতে পারে। আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আত্ম-পর্যবেক্ষণ এবং আত্ম-ভ্রান্তির এক মিশ্রিত ফল। OCD-র মতো অবস্থায় এই ভ্রান্তিগুলো চরম রূপ ধারণ করে যা প্রকৃত সত্তাকে আড়াল করে দেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন