নস্টালজিয়া শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে পুরনো দিনের স্মৃতি ভেসে ওঠে। এটি এমন এক অনুভূতির নাম যা অতীতের কোনো বিশেষ সময়ের প্রতি গভীর আবেগ তৈরি করে। তবে আজকের দিনে নস্টালজিয়া সাধারণ একটি আবেগ হিসেবে স্বীকৃত হলেও একসময় এটিকে মানসিক রোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। সময়ের বিবর্তনে নস্টালজিয়ার সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা বদলেছে। নস্টালজিয়া শব্দটির প্রথম ব্যবহার হয় ১৬৮৮ সালে। সুইস চিকিৎসক জোহানেস হোফারের মাধ্যমে। তিনি এটি গ্রিক শব্দ “নস্টোস” (বাড়ি ফেরা) এবং “অ্যালগোস” (ব্যথা) থেকে তৈরি করেছিলেন, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বাড়ি ফেরার ব্যথা’। প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি গুরুতর রোগ হিসেবে গণ্য হতো। যার উপসর্গের মধ্যে ধরা হতো বিষন্নতা, বিভ্রান্তি, অনিদ্রা, এমনকি ক্ষুধামন্দাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। দীর্ঘ সময় বাড়ি থেকে দূরে থাকা সৈন্য, শিক্ষার্থী এবং অভিবাসীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যেত।
১৭শ ও ১৮শ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নস্টালজিয়াকে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক রবার্ট হ্যামিল্টন এক সৈন্যের মধ্যে নস্টালজিয়ার তীব্র প্রভাব লক্ষ্য করেন। তিনি দেখতে পান, ওই সৈন্য তার বাড়ি ও পরিবারকে এতটাই মিস করছিলেন যে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। যখন তাকে বাড়ি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তখনই পুরোদমে তার সুস্থতা ফিরে আসে! নস্টালজিয়া রোগের প্রভাব শুধু ইউরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকাতেও এটি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত আফ্রিকান ক্রীতদাসদের মধ্যে, যারা জোরপূর্বক নতুন ভূখণ্ডে আনা হয়েছিল। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় অনেক সৈন্যকেও নস্টালজিয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়। এমনকি বিষণ্ণতা থেকে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছিল।
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পশ্চিম ফ্রন্টে এক সৈন্যকে নস্টালজিয়ার রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যা ইতিহাসে নথিভুক্ত শেষ ঘটনা। এরপর থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি আর রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং একটি মানসিক অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিশ শতকের শুরুতে মনোবিজ্ঞানীরা নস্টালজিয়াকে আর মানসিক রোগ হিসেবে দেখেননি। বরং গবেষণায় দেখা যায় এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। নস্টালজিয়া মানুষকে সুখের স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়। যা ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং সংযোগ তৈরি করতে সহায়তা করে।
নস্টালজিয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত আজও বিভক্ত। কেউ মনে করেন এটি একটি ইতিবাচক আবেগ যা জীবনকে অতীত-ভবিষ্যতের সহাবস্থানে সমৃদ্ধ করে। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ রবার্ট সন্ডার্সের মতে, নস্টালজিয়া এমন একটি মানসিক অবস্থা যা মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।


