নদীভাঙনে গত এক দশকে বাস্তুহারা ৩০ হাজার পরিবার

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি তীব্র সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটে রূপ নিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ধরলাসহ দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর আগ্রাসী ভাঙনে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষি জমি এবং বসতভিটা বিলীন হচ্ছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি কিংবা কুড়িগ্রামের মতো নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ফসলভরা মাঠ ও প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে তৈরি হচ্ছে কেবল আতঙ্ক আর হাহাকার।

নদীভাঙনের কারণে গ্রাম ও জনপদের দৃশ্য দ্রুত পাল্টে যায়। রতনপুর গ্রামের উদাহরণে দেখা যায়, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৫০ বিঘা জমি বিলীন হওয়ায় অন্তত ২০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এই গৃহহারা পরিবারগুলো স্বজনদের বাড়ি বা উঁচু স্থানে অস্থায়ী বসতি স্থাপন করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কুড়িগ্রামের স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই হাজার পরিবার সরাসরি তাদের বসতভিটা হারায়, যার ফলস্বরূপ গত ১০ বছরে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতদের একটি বড় অংশ (৭০ ভাগ) নদ-নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন চরে পুনরায় বসতি গড়তে বাধ্য হয়। তবে এই চরগুলোতে বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশনসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলোর তীব্র অভাব থাকে। বাকি ৩০ ভাগ পরিবার উন্নত জীবনের আশায় উঁচু এলাকা বা ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় কাজের সন্ধানে স্থানান্তরিত হয়, যা দেশের বড় শহরগুলোর ওপর চাপ বাড়ায়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, নদীভাঙনে তারা যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেই তুলনায় স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সহযোগিতা পান খুবই সামান্যই। নদীভাঙনে প্রতি বছর কতজন মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, তার সঠিক সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। যদিও বন্যায় বাস্তুচ্যুতরা পানি নেমে গেলে নিজ বসতিতে ফিরতে পারলেও নদীভাঙনে ভিটেমাটি বিলীন হওয়া মানুষের অধিকাংশের পক্ষেই আর আগের জায়গায় বসতি গড়া সম্ভব হয় না।

ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্যমতে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর মধ্যে ৪৪ লাখেরও বেশি ছিল বাংলাদেশের, যাদের বেশিরভাগই নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। এই বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বস্তিতে ঠাঁই নেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের কারণে কোনো কোনো পরিবার ২৭ বার পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হওয়ার নজির আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে। অকালবৃষ্টি, বন্যা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বাঁধ না থাকার কারণে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

দেশের সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা ও যমুনা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, দেশের সবচেয়ে বেশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হন পদ্মা ও যমুনাপাড়ের বাসিন্দারা। ২০১৮ সালে নাসা এক গবেষণায় জানিয়েছিল, ১৯৬৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে ৬৬ হাজার হেক্টরের (প্রায় ২৫৬ বর্গমাইল বা ৬৬০ বর্গকিলোমিটার) বেশি এলাকা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে, যা ঢাকা শহরের আয়তনের প্রায় আড়াই গুণের সমান। ওই প্রতিবেদনে পদ্মাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী স্প্রিংগার নেচার ১০৫ বছরে পদ্মার ভাঙন নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, ১৯১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে পদ্মার ভাঙনের শিকার হয়েছে এর দুই পারের ১ হাজার ৭৪৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা। আর পলি পড়ে গড়ে উঠেছে ১ হাজার ৩১৬ বর্গকিলোমিটার। ওই সময়ে পদ্মাপারের মানুষ ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে।
১৯১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পদ্মার ভাঙনে ১ হাজার ৭৪৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে।

বুয়েট বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন শুধু বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে না এটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও কৃষক পরিবারগুলো সব হারিয়ে একপর্যায়ে কৃষি ছেড়ে শহরে গিয়ে নানা শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ স্থানান্তরিত হবে, যার মধ্যে শুধুমাত্র নদীভাঙনের কারণেই ২০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ স্থানান্তরিত হতে পারে।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং বাস্তুহারা মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন