“ … এখানে বিকাশমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা থেকে বহু দূরে অথবা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনের প্রকৃতি ও পরিণতি প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে এবং বিবাদ-বৈরিতার অশুভ শক্তিগুলো আবার বেরিয়ে এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর পুনর্জন্ম হয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে তারা আরও প্রাসঙ্গিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। বক্তৃতা-বক্তব্যে সংযম প্রদর্শন করলেও তাদের অন্যতম প্রধান একটি উদ্দেশ্য হলো ঐতিহাসিক বয়ান পুনরায় লেখা, যেন তাদের ১৯৭১ সালের বীর না হলেও অন্তত ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভুল শত্রুর বিরুদ্ধে ভুল যুদ্ধে জড়িয়েছিল।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা যাঁরা এখন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, তাঁদের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর এই বয়ান নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করছেন। এ কারণে তাঁরা ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিলের দাবি তুলেছেন। রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পথবিচ্যূত এই দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ধ্বংস করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এমন আরও কিছু কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এসব হামলা বন্ধের জন্য ইউনূস অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে দৃঢ়তার ঘাটতি ছিল। ফলে আমাদের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার স্বপ্ন দেখা গোষ্ঠীগুলোকে থামানো যায়নি।
আওয়ামী লীগের সদস্য, এমনকি তাঁদের সন্দেহভাজন সহযোগীদের ওপর হামলার জন্য জড়ো হওয়া উচ্ছৃঙ্খল জনতা এখন পর্যন্ত দায়মুক্তি পেয়ে আসছে। এটি লুটতরাজে আগ্রহী দুষ্কৃতকারীদের বৃহত্তর একটি গোষ্ঠীকে ছাড়পত্র দিয়েছে, যারা বিগত সরকারের সহযোগী তকমা দিয়ে যে কারও বাড়িতে হামলা চালাতে পারে। উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের এই অক্ষমতা তথাকথিত নীতিপুলিশের ভূমিকা পালনকারী একটি গোষ্ঠীকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই গোষ্ঠী মনে করে, নতুন ব্যবস্থা তাদের অসহিষ্ণু বহুত্ববাদবিরোধী বিশ্বাস বাস্তবায়নের জন্য আরও বেশি অনুকূলে। এসব গোষ্ঠী তাদের মূল্যবোধ শুধু নারীদের ওপরই নয়, অন্যান্য দুর্বল সম্প্রদায়ের ওপরও চাপিয়ে দিতে চায়।
বাংলাদেশ ও দেশের বাইরের কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, ১৯৪৭ বনাম ১৯৭১ নিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক যে অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব ছিল, তা এখনো মিটে যায়নি, যদিও আঞ্চলিক পটভূমিতে উল্লেখ করার মতো প্রাসঙ্গিক কিছু পরিবর্তন এসেছে। যাঁরা শুধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন না; বরং বাংলাদেশের জন্মেরই বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাই এই বিতর্ক উসকে দিয়েছেন, যা খোলাখুলিভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। আর তাই এটি কখনো সমাধান হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ যে অসংখ্য সমস্যার মুখে রয়েছে, তা জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের ক্ষেত্রে এর বাস্তবিক প্রাসঙ্গিকতা হয়তো তেমন নেই। তবে আমরা আমাদের আন্ত–আঞ্চলিক সম্পর্ককে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব; সে ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
১৯৭১ সালের ঘটনাবলির আলোচনা এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছে, যারা ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। মনে করা হয়, হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি সেই বিদ্বেষকে আরও জোরালো করছে। ভারতের প্রতি এই মনোভাবকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরও উসকে দিচ্ছেন কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার। এঁদের কেউ কেউ দেশের বাইরে থেকে কাজ করছেন। ‘ভারতপন্থী’ বলে আখ্যা দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাতে তাঁরা তাঁদের অগুনতি ফেসবুক অনুসারীদের উৎসাহিত করেছেন, যদিও সেই আখ্যা একেবারে ভিত্তিহীন।
১৯৭১ বিরোধী এই বয়ানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠান, ছাপা পত্রিকা এবং কিছু জনপরিসরে প্রতিরোধ চলছে। তবে জোরালোভাবে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রে তথাকথিত উদারপন্থী বা ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী পিছিয়ে আছে, যেমনটা আওয়ামী লীগের শাসনামলেও দেখা গিয়েছিল। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও জনরোষের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় উদারপন্থীদের মধ্যে এমন দ্বিধা তৈরি হয়েছে। … ”


