বর্তমান দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মব্যস্ততা, সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার ভিড়ে আমাদের মানসিক প্রশান্তি যেন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিদিন মাত্র ৪০ মিনিট শিল্পচর্চা মানসিক চাপ কমাতে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকর।
গবেষক গিরি এন কিরক এবং তাঁর দল ২০১৬ সালে ৩৯ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে এই সমীক্ষা পরিচালনা করেন। অংশগ্রহণকারীদের বয়স, পেশা বা শিল্পগত পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল বৈচিত্র্যময়। তাদেরকে বিভিন্ন শিল্পচর্চামূলক কর্মকাণ্ড—যেমন আঁকাআঁকি, রঙ করা, কোলাজ তৈরি ইত্যাদিতে যুক্ত করা হয়। ৪০ মিনিটের এই কর্মকাণ্ডের আগে ও পরে অংশগ্রহণকারীদের লালা নমুনা সংগ্রহ করে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা পরিমাপ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৭৫ শতাংশের কর্টিসল স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পূর্ব অভিজ্ঞতা বা শিল্প-দক্ষতা এই মানসিক প্রশান্তির ওপর তেমন কোনো প্রভাব রাখেনি। অর্থাৎ আপনি পেশাদার শিল্পী হোন কিংবা শৌখিন, শিল্পচর্চার ইতিবাচক প্রভাব সবাই প্রায় সমানভাবেই উপভোগ করেন।
গবেষক কিরক-এর ভাষায়, “শিল্পচর্চা আমাদের এমন এক মানসিক স্থান দেয় যেখানে আমরা নিজের চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতির সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করি। এটি একধরনের মননশীল ধ্যান (mindful meditation)-এর কাজ করে।” এই প্রক্রিয়ায় কর্টিসলের ক্ষরণ কমে যায়, ফলে দেহ-মনে প্রশান্তি নেমে আসে।
বাংলাদেশের মতো শিল্প, সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশে এই গবেষণার তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পাটচিত্র, আলপনা, নকশীকাঁথা, বাঁশ ও মৃৎশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেগুলো মানসিক প্রশান্তির উৎস হতে পারে।
এই গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, স্ট্রেস থেকে মুক্তি পেতে মেডিটেশন বা ওষুধের পাশাপাশি আমরা দৈনন্দিন জীবনে সহজেই শিল্পচর্চাকে যুক্ত করতে পারি। রঙ তুলিতে ছবি আঁকা, শখের গহনা তৈরি, কিংবা পুরোনো ফটোগ্রাফ কোলাজ — যেকোনো সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনন্য উপকারী হতে পারে।
সুতরাং আধুনিক জীবনের ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার ভিড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট নিজের জন্য সময় বের করুন। ক্যানভাসে রঙ ছড়ান, কিংবা কাগজে আল্পনা আঁকুন। বিজ্ঞান বলছে এতে আপনার মন হালকা হবে, শরীরও প্রশান্তি পাবে।


