প্রতিদিন আমাদের মাঝে থেকেই আচমকা কোনো না কোনো জীবন নিজের হাতে স্বেচ্ছায় থেমে যায়। ছোট্ট জীবনেও দীর্ঘকাল বাঁচার পরে হুট করে হাঁটার ক্লান্তি যাদের পা চেপে ধরে, তাদের মৃত্যুর জন্য তারা নিজেরা নয়, রাষ্ট্র-সমাজসহ আমরা সকলেই দায়ী। বাংলাদেশে আত্মহত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন আত্মহত্যা করেন। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি অসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু। সমাজের চাপ, অবহেলা, আর মানসিক যন্ত্রণার কাছে হেরে গিয়ে মানুষ নিরুপায় হয়ে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলছে।
গত কয়েকদিনে বেশ কিছু হৃদয়বিদারক আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এক মিষ্টি ব্যবসায়ী মোবাইল ফোনে ভিডিও চালু রেখে নিজের জীবন শেষ করেছেন। তার যন্ত্রণার সাক্ষী শুধু সেই অনলাইন দর্শক, যারা কিছুই করতে পারেনি। এদিকে গত এক বছরে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যাদের ৪৬.১ শতাংশ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী। তারা হয়তো চেয়েছিল একটু বোঝাপড়া, একটু সহানুভূতি। কিন্তু সমাজ তাদের বোঝার আগেই তারা বিদায় নিয়েছে। বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে প্রায় ৭.৮ জন। ল্যানসেটের গবেষণা বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আত্মহত্যার শিকার ৬০% মানুষই ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী। এই তরুণ প্রাণগুলো নিজেদের হারিয়ে ফেলছে মানসিক চাপে, পারিবারিক সংকটে কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২২ সালে আত্মহত্যা করেছে ১৪,৪৩৬ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫% বেশি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, ৭০% আত্মহত্যার কারণ মানসিক অবসাদ এবং পারিবারিক কলহ।আরও একটি জরিপে দেখা গেছে, আত্মহত্যার আগে ৮০% মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও, মাত্র ১৫% স্বেচ্ছায় চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেন। সমাজের ভয়, লোকলজ্জা, আর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা তাদের একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়নে পরিচালিত জরিপ বলছে, দেশে ১ লাখ মানুষে ১২ জন আত্মহত্যা করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় জাতীয় জরিপ (২০২২২৩) করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্ট, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। ২০১৬ সালেও তারা জরিপ করেছিল।
তাদের জরিপ বলছে, দুর্ঘটনার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার পর দৈনিক সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান আত্মহত্যায়। ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী নারীদের এবং ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। শহরের চেয়ে গ্রামে আত্মহত্যার হার বেশি।আত্মহত্যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে বেকারদের মধ্যে। গলায় ফাঁস ও কীটনাশক পান আত্মহত্যার জন্য মানুষ এই দুটি পথই বেশি বেছে নিচ্ছেন। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ১০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে। পারিবারিক সহিংসতা, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, সম্পর্কজনিত হতাশা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৬০% আত্মহত্যাকারী নারী কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ছিলেন। সমাজ যেখানে তাদের কষ্ট বোঝার পরিবর্তে দোষারোপ করে, সেখানে তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপর্যাপ্ত। প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অভাব, মানসিক অসুস্থতা নিয়ে সামাজিক ট্যাবু, এবং পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে মানুষ ক্রমাগত একাকীত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এসব মিলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। অথচ একটু বোঝাপড়া, একটু সহানুভূতি, একটু সাহায্য হয়তো কারও জীবন বাঁচাতে পারতো। আত্মহত্যা আসলে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। হারিয়ে যাবার মধ্যে শান্তি আছে কিনা সেটা যারা হারিয়েছে তারাই জানে, আমরা জানিনা। এখানে আমাদের দায়িত্ব হলো সকলের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আরও সংবেদনশীল হওয়া, অন্যের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা এবং সময় থাকতেই পাশে দাঁড়ানো। মূলত পৃথিবী সুন্দর খুবই হওয়া জরুরি।


