এই মুহুর্তে গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যের উপর। কমলা হ্যারিস জিতবেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতবেন তা নিযে চলছে জল্পনা কল্পনা ও ডেমোক্র্যাটরা জিতলে তাদের প্রশাসনের বর্তমান নীতিগুলিকে অব্যাহত রাখার কথা, আর রিপাব্লিকানরা জিতলে আমেরিকার প্রশাসন ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” অবস্থানে ফিরে যাবে ও এতে শুধু আমেরিকাই প্রভাবিত হবে না, প্রভাবিত হবে গোটা বিশ্ব।
ইউরোপ, ন্যাটো এবং আন্তঃমহাদেশীয় সম্পর্ক
বাইডেন প্রশাসন ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে কাজ করেছেন এবং ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাবকে দমানো ও কমানোর জন্য সেখানে ন্যাটোকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। সম্প্রতি, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন উভয়ই এই জোটে যোগ দিয়েছে। এই সম্প্রসারণ উত্তর ইউরোপে ন্যাটোর উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে ওই অঞ্চলে রাশিয়ার শক্তি ও প্রভাবকে খর্ব করেছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশ যেমন ইউক্রেন এবং জর্জিয়ারকেও ন্যাটোর সদস্য বানাতে আগ্রহী যেটা রাশিয়ার জন্য একটি সরাসরি হুমকি, এবং ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে ও ইউরোপের শক্তি ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। কমলা হ্যারিস নির্বাচিত হলে তার প্রশাসন সম্ভবত একই নীতিগুলো বজায় রাখবে।
যদি ট্রাম্প নির্বাচিত হন, তাহলে যুক্তরাষ্টের ন্যাটোর সাথে তুলনামূলকভাবে একটি বেশি লেনদেনমূলক তৈরী হতে পারে ও অতীতে ট্রাম্প ন্যাটোতে আমেরিকার অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলিকে ন্যাটোতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ দিয়েছিলেন। ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং প্রায়ই রাশিয়ার সাথে উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন।
এশিয়া-প্যাসিফিক
এশিয়া-প্যাসিফিক বিশেষ করে তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের অন্যান্য প্রধান দেশগুলোর সাথে আমেরিকার সম্পর্কে নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। যদি কমলা হ্যারিস নির্বাচিত হন, তবে তাঁর প্রশাসন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাইডেন সরকারের কৌশলগত ফোকাস হিসেবে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে মোকাবেলা করার জন্য জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক মজবুত করবে। এর ফলে অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেতে পারে ও তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প জিতলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটা মিশ্র পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে। ট্রাম্প প্রশাসন পূর্বে উত্তর কোরিয়ার সাথে কূটনৈতিকভাবে যুক্ত হতে চেষ্টা করেছে এবং আবার একই সাথে চীনের নীতিগুলির বিরুদ্ধে তাইওয়ানে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর আগ্রহও দেখিয়েছে। ট্রাম্পের আচরণ চীনকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে আরও মুখোমুখি অবস্থান নিতে পারে, যা তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরে ভূখণ্ড বিরোধের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভারত, বাংলাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
যদি কমলা নির্বাচিত হন, তবে ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্বটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাইডেন প্রশাসন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে গুরুত্ব দিয়েছেন, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমানোর একটা স্ট্রাটেজি ও তাছাড়া ভারতীয় বাজারে আমেরিকান পণ্যের (যেমন iphone) সম্প্রসারণ করাও এই স্ট্রাটেজির পিছনের একটা কারণ হতে পারে ও কামালা হ্যারিসের প্রশাসনের ভারতের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকলে, দুদেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি ট্রাম্প নির্বাচিত হন, তাহলে মার্কিন-ভারত সম্পর্কের গতিবিধি খুব একটা পরিবর্তিত নাও হতে পারে। ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্কগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, চীনের আগ্রাসনের মোকাবেলায় ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রির উপর জোর দিতে পারে। যদি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হন, তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. ইউনুসের সাথে ডেমোক্রাট নেতৃত্বাধীন বাইডেন প্রশাসনের ভালো সুসম্পর্ক আছে। তবে রিপাবলিকান পার্টি (ট্রাম্প) ক্ষমতায় আসলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একই রকম থাকবে কি না সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। হতে পারে যে বাংলাদেশের উপর থেকে নজর কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য অন্যান্য কাজে বেশি মনোযোগী হবে ও আবার এরকমও হতে পারে যে, ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির ফলে, মার্কিন স্বার্থকে উপকারি করতে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তি শক্তিশালী করার উপর জোর দেয়া হতে পারে যা বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে পারে, বিশেষ করে বস্ত্র শিল্পে, যেখানে বাংলাদেশের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।


