“যুক্তরাষ্ট্র যে ধুয়া তুলে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করছে, তা এককথায় ভিত্তিহীন। বাণিজ্যঘাটতি থাকা মানেই খারাপ কিছু নয়। এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যে বাণিজ্যঘাটতির কথা বলে, তার মধ্যে শুভংকরের ফাঁকি আছে। ঘাটতির যে হিসাব দেওয়া হয়, তা মূলত পণ্য-বাণিজ্যের। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে ঠিক, কিন্তু একই সঙ্গে যে যুক্তরাষ্ট্রের সেবা-বাণিজ্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত আছে, সেটা তারা বলে না, বা সুবিধা নেওয়ার জন্য এড়িয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, ঠিক কী কারণে যুক্তরাষ্ট্র এ বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে।
সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আচরণ করেছেন, সেই ঘটনা থেকে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আঁচ করা যায়। সেটা হলো, উদীয়মান কোনো দেশকে আটকে দেওয়া। একসময় জাপানের বিরুদ্ধে একই অবস্থান নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। মুদ্রা কারসাজি থেকে শুরু করে নানাভাবে জাপানের উত্থান তারা ঠেকিয়ে দিয়েছে। এরপর বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকাতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে।
এত দিন চীনকে ঠেকানোর কৌশলের অংশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে খাতির রাখলেও শুল্ক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কদর্যভাবে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ভূ-অর্থনীতির প্রভাব ভূরাজনীতিতেও পড়বে।
… বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপানের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র খারাপ ছিল না।
… দীর্ঘ আট দশক ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল মুক্তবাণিজ্যের ধারক ও বাহক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের যুগে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার আওতায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (জিএএটি ও পরবর্তী ডব্লিউটিও), বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে শিখিয়েছে, ‘বাণিজ্য উন্মুক্ত করো, শুল্ক কমাও, প্রতিযোগিতা বাড়াও’। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই ইতিহাসে নাটকীয় মোড় পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন, বাতিল করেন, আবার আলোচনায় বসেন বা তাতে কঠোর শর্ত জুড়ে দেন। এর পেছনে আছে তাঁর তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। এর মূল দর্শন হলো, ‘যা আমেরিকার জন্য ভালো নয়, তা আমরা মানব না।’ বাণিজ্যচুক্তির শর্ত হিসেবে তিনি চেষ্টা করছেন, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বোচ্চ রক্ষা করা যায়; দেশগুলোকে বাধ্য করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কিনতে।
অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে মুক্তবাণিজ্যের মূল শর্তই ক্ষুণ্ন করছেন ট্রাম্প। বিশ্বায়নব্যবস্থা ছুড়ে ফেলছেন। অর্থাৎ যত দিন বিশ্বায়ন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করেছে, তত দিন তারা এর পক্ষে সাফাই গেয়েছে, এর সপক্ষে নানা বয়ান তৈরি করেছে।
মোদ্দাকথা, পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পতনশীল। চীন উঠে আসছে। সেই সঙ্গে আছে ভারতসহ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো।…এখন যখন চীনের মতো দেশ উঠে আসছে, বিশ্বব্যবস্থায় তাদের যথাযথ স্থান দেওয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্যোগ বিশ্বব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
… ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বায়নের অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যেখানে ফেরত যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সম্ভবত তাঁর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে অন্যান্য দেশের উত্থান যতটা সম্ভব ঠেকানো যায়, তা নিশ্চিত করা।”
(দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংক্ষেপিত)


