একটি ছোট শহরে যেখানে প্রায় সবাই একে অপরকে চেনে, তাদের মধ্য থেকেই একদিন হঠাৎ করে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে গেলেন।পরিবারের লোকেরা বহুদিন ধরে তার খোঁজ করে কোনো কোনো চিহ্ন না পেয়ে একসময় হয়তো আশা’ই ছেড়ে দিলেন। অথচ তিনি যখন বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তখন কি সব কিছু স্বাভাবিক ছিল? জীবনে এমন কি ঘটেছিল যে চিরতরে চিরচেনা সমস্ত আয়না পেছনে ফেলে সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আরেকটি নতুন জীবন শুরু করতে পালালেন? আকস্মিক এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি “জোহাতসু” নামে পরিচিত একটি জাপানি সংস্কৃতির অংশ।
জোহাতসু” শব্দটির অর্থ হল এভাপোরেশন বা “অদৃশ্য হয়ে যাওয়া”। এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে কেউ নিজের পরিচয় এবং জীবনের সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে, সমাজ এবং পরিবারের সাথে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জোহাতসু-র মাধ্যমে এই ব্যক্তি পুরোনো জীবন থেকে মুক্তি পেতে চান এবং একটি নতুন জীবন শুরু করতে চান, যেখানে তার পুরানো পরিচয়ের কোনো চিহ্ন থাকবে না। এটি এক ধরনের আত্মগোপন, যেখানে কেউ নিজেকে সমস্ত পরিচিতদের কাছ থেকে অদৃশ্য করে দেয় এবং নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে।
কেন মানুষ জোহাতসু করেন?
জোহাতসু করা মানে হয়তো জীবনের অন্ধকার থেকে পালিয়ে যাওয়া, পালাতে চাওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জোহাতসু করার পেছনে রয়েছে গভীর মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যাগুলি বা এমন কিছু পরিস্থিতি যেখানে ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চান।জীবনে যে পরিমাণ ভোগান্তি সৃষ্টি হয়, তা হয়তো আর সহ্য করতে পারেন না এবং নতুন পরিচয়ে আত্মগোপন করার সিদ্ধান্ত নেন।
জোহাতসু’র ধারণাটি মূলত ১৯৬০-এর দশকে জাপানে উদ্ভুত হয়। জাপানে তখনকার সময়ে শিল্প বিপ্লবের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কিন্তু এই চাপের মধ্যে অনেক মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকে, জাপানকে যখন আর্থিক মন্দা মোকাবিলা করতে হচ্ছিল, তখন এই প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। সেই সময় অনেক মানুষ জোহাতসু’র পথ বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তারা অসংখ্য সমস্যার ভেতরে ডুবে তাদের পুরোনো জীবন থেকে পালাতে চেয়েছিলেন।
জাপানে এমন কিছু কোম্পানিও রয়েছে যারা মানুষকে বিশেষভাবে জোহাতসু-তে সাহায্য করে। এই কোম্পানিগুলি মানুষের জীবন থেকে সব চিহ্ন মুছে ফেলতে সহায়তা করে এবং তাদের নতুন পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করে। তারা সেসব মানুষের জন্য নতুন ঠিকানা খুঁজে দেয়, পুরোনো পরিচয় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে এবং নতুন জীবন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু ব্যবস্থা করে দেয়। এমনকি কিছু কোম্পানি মানুষের জন্য নতুন নাম, নতুন কাজ এবং নতুন সম্পর্ক গড়ে দেয়।
এটি কি শুধুমাত্র জাপানের সমস্যা?
“জোহাতসু” জাপানী সংস্কৃতির একটি অংশ হলেও এই ধরনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ঘটতে দেখা যায় যেখানে মানুষ অতিরিক্ত সামাজিক বা পারিবারিক চাপের কারণে নতুন জীবন শুরুর জন্য নিজেকে গোপন করে ফেলেন। এটি কোনো একক দেশের সমস্যা নয় বরং একটি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঘটনা যা মানুষের মনস্তত্ত্বে আরও বেশি প্রভাব ফেলছে।
এমনকি যারা জোহাতসু’র মাধ্যমে নিজেদের জীবন বদলাতে যায়, তারা নিজের পরিবার এবং বন্ধুদের জন্য গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করে।যারা নিখোঁজ হয়ে যান তাদের প্রিয়জনরা নিঃশেষ হয়ে যায়, তাদের স্বজনদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না এবং তারা কিছুতেই তাদের ফিরে পাবার পথ খুঁজে পায় না। এই সমস্যাটি শুধুমাত্র অদৃশ্য হয়ে যান সেসব ব্যক্তিদের জন্য নয়, তাদের কাছের মানুষদের জন্যও একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হিসেবে বেঁচে থাকে।
জোহাতসু’র একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি আত্মহত্যা বা আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে আলাদা। অনেক সময় মানুষ জোহাতসু-এর মাধ্যমে তাদের পুরোনো জীবনের সমস্ত কিছু ছিন্ন করে ফেললেও কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য জীবন শেষ করা নয়। বরং তারা একটি নতুন শুরু চাইছেন যেখানে অতীতের কোনো চিহ্ন থাকবে না। এটি সমাজের চাপ থেকে পালানোর এক নতুন পথ হতে পারে।
জোহাতসু’র চিন্তা যদি কখনও আপনার জীবনে ঘটে, তবে সেটা আপনার পুরোনো জীবন থেকে পালানোর উপায় হতে পারে, তবে সেটা যে সুখী ও শান্তিপূর্ণ জীবন এনে দিতে পারে সে নিশ্চয়তা তো নেই! এটি আসলে এমন একটি প্রতিফলন যেখানে একজন মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজের অস্তিত্বের মূল্য পুনঃপরীক্ষা করতে চায়। অভ্যন্তরীণ চাপ এবং হতাশা মানুষের আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং তাদের নিজের পরিচয়ের প্রতি সংশয়ের সূচনা হতে পারে। যখন তাদের সামনে কোনো আলো দেখা যায় না, তখন তারা অনিশ্চয়তার হাত ধরেই অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।


