চীনের তিব্বতে ইয়ারলুং স্যাংপো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ অনুমোদন সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পটি যখন সম্পূর্ণরূপে চালু হবে, তখন এটি হবে বিশ্বের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, যেখানে ক্ষমতা ও পরিধির দিক থেকে পূর্ববর্তী রেকর্ডগুলো অনায়াসেই ছাড়িয়ে যাবে। তবে এই প্রকল্পের পরিবেশগত বিপর্যয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং নিম্ন অববাহিকার দেশসমূহে—বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের—জলনির্ভর সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইয়ারলুং স্যাংপো ভারত ও বাংলাদেশে সিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত, এর উৎপত্তি তিব্বতের ‘বিশ্বের তৃতীয় মেরু’ নামে খ্যাত হিমবাহ অঞ্চল থেকে। এখানকার বরফঢাকা গ্লেসিয়ারসমূহ পৃথিবীর আর্কটিক ও আন্টার্কটিকার বাইরে বৃহত্তম হিমসঞ্চয়। এই নদী ও এর শাখাগুলি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তান থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত প্রায় একশো কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। অথচ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গ্লেসিয়ার গলন, অনিয়মিত বর্ষণ ও পানিপ্রবাহের মৌসুমি বৈচিত্র্য ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
চীনের প্রস্তাবিত ইয়ারলুং স্যাংপো গ্র্যান্ড ড্যাম প্রকল্পের অবস্থান ভারত-ইউরেশিয়ান প্লেটের টেকটোনিক সংযোগস্থলে, প্রকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে নির্মিত হতে যাচ্ছে। এই ভূতাত্ত্বিক ভঙ্গুরতা ভূমিকম্প, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একইসাথে ব্রহ্মপুত্র নদী বিশ্বে অন্যতম অববাহিকাসমৃদ্ধ ও পলিমাটির বাহক নদী হওয়ায়, উজানে বিশাল বাঁধ নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক পলিপ্রবাহ ব্যাহত করবে।
বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ও ভারতের আসামভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি সরাসরি এই পলিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং উজানে পলি আটকে পড়লে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিক্ষেত্রের উর্বরতা এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। উল্লেখ্য সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল এবং পূর্ব থেকেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো চীন-ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এই নদীর জলব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে কোনো বহুপাক্ষিক, বাধ্যতামূলক ও সমন্বিত চুক্তি নেই। এর ফলে যেকোনো প্রকল্প বা দুর্যোগ মোকাবেলায় যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তুলনামূলকভাবে ইউরোপের দানিউব নদী নিয়ে ১৪টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা একটি কার্যকর মডেল হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এমন উদ্যোগের অভাব প্রকট।
অতিসাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী ২৮৬টি আন্তসীমান্ত নদী অববাহিকার মধ্যে দক্ষিণ গোলার্ধের নদীগুলোয় গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত মনোযোগ অত্যন্ত কম। অধ্যাপক মেহেবুব সাহানা ও তাঁর সহকর্মীরা পরিচালিত সমীক্ষায় ৪,৭১৩টি ক্ষেত্রে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে উত্তর গোলার্ধের বড় নদীগুলিতে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক গবেষণায় প্রবল গুরুত্ব দিলেও দক্ষিণ গোলার্ধের ছোট ও মাঝারি নদীগুলো, যেখানে পানিকষ্ট ও সংঘাত প্রকট, সেখানে গবেষণা ও তথ্য ঘাটতিও প্রকট।
দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দাস ও মেকং নদী নিয়ে তুলনামূলক বেশি গবেষণা হলেও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলোয় স্থানীয় প্রাসঙ্গিক ইস্যুগুলো বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।
এই গবেষণা-অসমতা প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশের জন্য নীতিনির্ধারণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় এক বড় অন্তরায়। জলপ্রবাহ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও মানব-প্রকৃতি সম্পর্কিত বাস্তবিক ডেটা অভাবে কার্যকর পরিকল্পনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশঝুঁকি বেড়ে যায়।
এ পর্যায়ে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বিশেষত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গবেষণাভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত সমঝোতা প্রয়োজন। শুধু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র নয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষিজীবী ও পরিবেশবিদদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা জরুরি। তা না হলে চীনের ইয়ারলুং স্যাংপো গ্র্যান্ড ড্যাম প্রকল্প একদিকে যেমন শক্তির রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে, অন্যদিকে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে এক দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ও মানবিক সংকট ডেকে আনবে।


