হিপনোসিস শব্দটি গ্রিক শব্দ “Hypnos” (নিদ্রা) থেকে এসেছে, যার অর্থ ঘুম। যদিও হিপনোসিস ঘুম নয় এটি এক ধরনের ট্রান্স অবস্থা. যেখানে ব্যক্তি বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে যায় এবং চেতন মন অপেক্ষাকৃত নিস্তেজ থাকে। ১৮৪৩ সালে স্কটিশ সার্জন জেমস ব্রেড প্রথমবারের মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিপনোসিসকে ব্যাখ্যা করেন। এরপর সিগমুন্ড ফ্রয়েড এটিকে মনোচিকিৎসার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তবে প্রাচীন মিশর, ভারত ও চীনে হিপনোটিক ট্রান্সের ব্যবহার বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। অনেক গবেষক মনে করেন, হিপনোসিসের মাধ্যমে ব্যক্তি তার অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। যেখানে অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির ক্ষমতা সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। হিপনোসিসের মাধ্যমে কিছু মানুষ দাবী করেছেন যে তারা টেলিপ্যাথি বা ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতাও লাভকরেছেন।
১৯৭০-এর দশকে স্ট্যানফোর্ড গবেষণা ইনস্টিটিউটে পরিচালিত এক পরীক্ষায় কিছু ব্যক্তিকে হিপনোসিসের মাধ্যমে টেলিপ্যাথিক যোগাযোগের চেষ্টা করতে বলা হয়েছিল। গবেষকরা লক্ষ্য করেন কিছু অংশগ্রহণকারী তাদের অংশীদারের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে কিছুটা সঠিক তথ্য দিতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও এই গবেষণার ফলাফল বিতর্কিত। তবুও এটি ঊঝচ নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে বিবেচিত হয়। হিপনোসিসের মাধ্যমে কিছু মানুষ অতীত জীবনের স্মৃতি মনে করতে পারে বলে দাবি করা হয়। যদিও এটিও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তবু অনেক মানুষ তাদের হিপনোটিক সেশনের মাধ্যমে এমন সব অভিজ্ঞতা অর্জন করার কথা বলেন।
১৯৫০-এর দিকে হিপনোথেরাপিস্ট মরিস নেটারটন এমন কিছু রোগীদের নিয়ে পরীক্ষা চালান। যারা হিপনোসিসের মাধ্যমে পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে করতে পারতেন। তারা এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ দেন যা তাদের বর্তমান জীবনে জানা থাকার কথা নয়। তবে এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকায় এটি এখনো গবেষণার বিষয়। অনেক পারাসাইকোলজিস্ট বিশ্বাস করেন হিপনোসিসের মাধ্যমে মানুষ অন্য জগতের সত্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। কিছু মিডিয়াম বা আত্মার সংযোগকারী ব্যক্তিরা হিপনোসিসের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেন বলেও দাবি করেন।
১৯৯০ সালে গবেষক মাইকেল নিউটন হিপনোসিসের মাধ্যমে কিছু মানুষকে আত্মিক জগতের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তারা দাবি করেন তারা হিপনোটিক অবস্থায় এমন জায়গায় পৌঁছান যেখানে তারা মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। যদিও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি পারাসাইকোলজি গবেষণার একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা হিপনোসিসকে মস্তিষ্কের একটি পরিবর্তিত চেতনা অবস্থা হিসেবে দেখেন। নিউরোসায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে হিপনোসিস চলাকালীন মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশ বেশি সক্রিয় থাকে, যা আমাদের মনোযোগ, স্মৃতি এবং সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি নয় বরং মনের স্বাভাবিক একটি অবস্থা।
অনেক ক্ষেত্রেই হিপনোসিসকে মঞ্চে বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেখানে মানুষকে দিয়ে অদ্ভুত আচরণ করানো হয়। এছাড়া কিছু হিপনোথেরাপিস্ট মিথ্যা স্মৃতির সৃষ্টির মাধ্যমে ভুল তথ্য প্রদান করতে পারেন বলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। তাই, হিপনোসিসের বৈজ্ঞানিক এবং নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পারাসাইকোলজিতে হিপনোসিস একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে হিপনোসিসের অতিপ্রাকৃত দিক এখনো নিশ্চিত নয়। এটি মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার একটি আকর্ষণীয় শাখা হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরো গবেষণা করলে হয়তো হিপনোসিসের প্রকৃত ক্ষমতা সম্পর্কে আরও গভীর বোঝাপড়া সম্ভব হবে।


