গাজীপুরের শ্রীপুরে বন বিভাগের দুটি রেঞ্জের প্রায় ৩৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বড় অংশই ভয়াবহ আগুনে পুড়ছে। প্রতিবছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এই আগুনের সূত্রপাত হয়, যেটি বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দখলদারদের যোগসাজশেই প্রতি বছর এই আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটছে। তবে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন এবং বেশ কয়েকটি ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীপুর রেঞ্জের সদর বিট অফিসের অধীনে গাজিয়ারণ গ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিশাল এলাকায় আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। বনের পাখিগুলো আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে। সাতখামাইর বিটের পোষাদিয়া এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা গেছে। রাস্তার দুই পাশে যত দূর চোখ যায়, শুধুই আগুনে পোড়া গাছের ধ্বংসাবশেষ। শাল-গজারি ছাড়াও বিভিন্ন লতাপাতা, গুল্ম, বাঁশ ও বেত পুড়ে গেছে। বন বিভাগের রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের আট হাজার একর বনাঞ্চলের বড় অংশই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে শিমলাপাড়া ও সাইটালিয়া গ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছোট গজারি কপিজ গাছের পাশাপাশি বড় গাছগুলোও আগুনের গ্রাসে পড়ে গেছে।
আগুনের তীব্রতায় সংরক্ষিত বনের ভেতর থাকা প্রাণীগুলো পালিয়ে যাচ্ছে। বানরসহ অন্যান্য প্রাণী গভীর জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। স্থানীয়রা বলছেন, বনকর্মীদের খবর দিলেও আগুন নিয়ন্ত্রণের আগেই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বনাঞ্চল রক্ষায় তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে বনাঞ্চলে আগুন লাগলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, একটি মহল বনভূমি দখলের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভাওয়ালগড় বাঁচাও আন্দোলনের’ মহাসচিব ড. এ কে এম রিপন আনসারী বলেন, “বছরের পর বছর ধরে বন পুড়ছে, অথচ কেউ এর সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে।”
শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, “বনে আগুন দেওয়ার পেছনে মাদকসেবীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তারা মাদক সেবনের সময় আগুন ব্যবহার করে, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া কিছু অসাধু চক্র গজারি কপিজ গাছ সংগ্রহের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বন পুড়িয়ে দেয়।” পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পরিবেশবিদরা বলছেন, অবিলম্বে বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা বন দখল রোধে টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বনাঞ্চলে বারবার আগুন লাগার রহস্য উদ্ ঘাটন ও প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।


