আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপদগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর অগ্ন্যুৎপাত মানুষের জীবন, সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পূর্বাভাস দেওয়া বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প, গ্যাস নিরীক্ষণ, ভূমি বিকৃতি পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি পদ্ধতিতে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা নিরীক্ষণ করা হলেও, এই পদ্ধতিগুলো সবসময় নির্ভরযোগ্য বা নিরাপদ নয়, বিশেষ করে দুর্গম ও বনভূমি এলাকায়।
সম্প্রতি নাসা ও স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, আগ্নেয়গিরির আশেপাশের গাছেরা আগাম সংকেত পাঠায়, যা স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। এই গবেষণাটি আগ্ন্যুৎপাত পূর্বাভাসে গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেছে।
আগ্নেয়গিরির মাগমা যখন উপরের দিকে উঠে আসে, তখন তা মাটির নিচে ও বায়ুমণ্ডলে অদৃশ্য কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) নির্গত করে। এই গ্যাস মাটির নিচে জমে থাকে এবং আশেপাশের গাছেরা এটি শোষণ করে। গাছের শ্বাস-প্রশ্বাস ও ফটোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত CO₂ গাছের পাতাকে সবুজ এবং আরও প্রতিফলক করে তোলে। এই পরিবর্তন সূক্ষ্ম হলেও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়।
গাছের এই পরিবর্তন মূলত দুটি পর্যায়ে ঘটে, প্রথমে CO₂ শোষণের ফলে গাছের পাতার সবুজতা বৃদ্ধি পায়, যা আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার সূচনা নির্দেশ করে। পরে যখন সালফার ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন গাছের পাতায় ক্ষতি হয় এবং গাছের রঙ বাদামী হতে শুরু করে। এই দুই বিপরীত প্রক্রিয়া আগ্নেয়গিরির গতিবিধির সূচক হিসেবে কাজ করে।
নাসার ল্যান্ডস্যাট ৮ ও ইউরোপের সেনটিনেল-২ স্যাটেলাইটগুলো আগ্নেয়গিরির আশেপাশের বনাঞ্চল পর্যবেক্ষণ করছে। আগ্নেয়গিরির কার্বন ডাই অক্সাইড সরাসরি সনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় গাছের পাতার রঙ ও স্বাস্থ্য পরিবর্তনকে একটি জীবন্ত সেন্সর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোস্টারিকার রিঙ্কন ডে লা ভিয়েজা আগ্নেয়গিরির নিকটে গাছের পাতার স্বাস্থ্য বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য স্যাটেলাইট ও এভুয়েলো মিশনের বিমান থেকে সংগৃহীত লেজার ডেটার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে।
এই প্রযুক্তি বনাঞ্চলের গাছেদের স্বাস্থ্য ও পাতার রঙের পরিবর্তনকে নিরীক্ষণ করে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে, যা আগ্ন্যুৎপাতের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
চিলি ও কোস্টারিকার আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে নাসা ও স্মিথসোনিয়ানের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার সময় গাছের পাতার সবুজতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই গবেষণায় স্যাটেলাইট ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গাছের স্বাস্থ্য পরিবর্তনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট বোগের নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় (১৯৮৪-২০২২) আমেরিকার ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের আগ্নেয়গিরির আশেপাশের বনাঞ্চলে গাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তারা দেখেছেন, আগ্নেয়গিরির সক্রিয় হওয়ার আগের সময় গাছের সবুজতা বৃদ্ধি পায় এবং আগ্ন্যুৎপাতের সময় গাছের স্বাস্থ্য হ্রাস পায়।
প্রচলিত পদ্ধতিতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পূর্বাভাসে ভূমিকম্প, মাটির বিকৃতি ও গ্যাস নিরীক্ষণ প্রধান ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই পদ্ধতিগুলো সবসময় কার্যকর নয়, বিশেষ করে দুর্গম ও বনভূমি এলাকায় যেখানে সরাসরি পর্যবেক্ষণ কঠিন। গাছের পাতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ একটি নিরাপদ, স্কেলেবল ও কম খরচে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই পদ্ধতি আগ্নেয়গিরির আশেপাশের বনাঞ্চল ও জলবায়ুর ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে অন্যান্য তথ্য যেমন ভূমিকম্প ও গ্যাস নিরীক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহৃত হলে একটি শক্তিশালী পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। নাসার গবেষক ফ্লোরিয়ান শওয়ান্ডনার বলেছেন, এটি হয়তো একক সমাধান নয়, কিন্তু আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটি একটি গেম চেঞ্জার হতে পারে।
গাছের পাতার পরিবর্তন নিরীক্ষণ সব আগ্নেয়গিরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ অনেক আগ্নেয়গিরি বনবিহীন বা শুষ্ক অঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া খরা, আগুন বা গাছের রোগের কারণে গাছের স্বাস্থ্য পরিবর্তন আগ্নেয়গিরির সংকেতের সঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তাই এই পদ্ধতিকে অন্যান্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সংযুক্ত করে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া স্যাটেলাইট ডেটার যথাযথ বিশ্লেষণ ও দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির প্রয়োজন।
গাছের পাতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগ্ন্যুৎপাতের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সম্ভাবনা আগ্নেয়গিরি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাপী আগ্নেয়গিরি মনিটরিং নেটওয়ার্কে এই পদ্ধতি সংযুক্ত করলে আগ্নেয়গিরি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। বিশেষ করে দুর্গম ও বনভূমি এলাকায় যেখানে প্রচলিত পর্যবেক্ষণ কঠিন, সেখানে গাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ একটি নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হতে পারে।


