ক্রিস্টোফার নোলানের Interstellar সময়ের সীমানায় মানবতার অর্থকে পুনর্নির্মাণ করে : ম্যাট জোলার সাইটস, RogerEbert.com

ক্রিস্টোফার নোলানের “ইন্টারস্টেলার” যেখানে কিছু মহাকাশচারী মানবজাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর বিকল্প নতুন বাসস্থান খুঁজতে গ্যালাক্সির এক প্রান্তে যাত্রা করে। চলচ্চিত্রটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যস্ত, আর শব্দের মাত্রা এতটাই উচ্চ যে কানে লাগে। যেসব দৃশ্য হয়তো খুব উত্তেজনাপূর্ণ নাও হতে পারত, সেগুলোকেও বুমিং মিউজিক দিয়ে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চরিত্ররা একে অপরকে অজস্র ব্যাখ্যা ও তথ্য শোনায়, আর এদের মধ্যে কয়েকজনের নিজের কোনো গভীর চরিত্রায়ণই নেই, তারা যেন কেবল প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সংলাপ ও দার্শনিক বিতর্কের মুখপাত্র।

নোলানের ফিল্মে শুটিংয়ের প্রতি অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও, ৩৫মিমি ও ৬৫মিমি ফিল্মের স্পর্শকাতর সৌন্দর্য সিনেমাটোগ্রাফির গঠনশৈলীতে সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি। নোলানের ক্যামেরা সচরাচর গল্প বলে না; বরং এটি শুধু চিত্রনাট্যকে “চিত্রিত” করে। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন আমি সবচেয়ে ব্যয়বহুল এনবিসি টিভি সিরিজের পাইলট এপিসোড দেখছি।

তবু “ইন্টারস্টেলার” এক অনবদ্য, কখনও কখনও বিস্ময়কর চলচ্চিত্র, যা আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করেছিল যে নোলানের কাজ নিয়ে আমার সাধারণ আপত্তিগুলো গলে গিয়েছিল। প্রথম অনুচ্ছেদে আমি সেই আপত্তিগুলো সাজিয়ে বলেছি (যা “ব্যাটম্যান বিগিনস”-এর পর তার প্রায় সব সিনেমার জন্য প্রযোজ্য)। আপনি নোলানের এই ধরণকে ভালোবাসবেন নাকি বিরক্ত হবেন, তা নির্ভর করবে তার স্টাইলের প্রতি আপনার টান কতটুকু।

যা-ই হোক সিনেমাটিতে এক ধরনের নির্মল ও শক্তিশালী কিছু আছে। আমার মনে পড়ে না, এর আগে এমন কোনো সায়েন্স ফিকশন ছবি দেখেছি যা বড় পরিসরে “দর্শক মাতানোর” মতো করে বিক্রি হলেও এত বেশি আবেগময় দৃশ্য দেখিয়েছে—যেখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্ররা ক্যামেরার সামনে খোলাখুলি কেঁদেছে, গলা ধরে এসেছে, চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়েছে। ম্যাথিউ ম্যাককনাহে’র বিধুর মহাকাশচারী কুপার এবং তার সহকর্মী আমেলিয়া ব্র্যান্ড (অ্যান হ্যাথাওয়ে) একাধিকবার কেঁদেছে এবং যৌক্তিক কারণেই। “এনডিউরেন্স” নামের মহাকাশযানের প্রতিটি ক্রু সদস্য তাদের প্রিয়জন, স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং পৃথিবী সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। অন্য চরিত্ররাও যেমন ব্র্যান্ডের বাবা (মাইকেল কেইন), একজন একাকী মহাকাশ অনুসন্ধানকারী (অপ্রকাশিত অতিথি অভিনেতা) নিঃসঙ্গতা ও সন্দেহে ভুগছে, যা নোলানের জন্য অস্বাভাবিক রকম কাঁচা আবেগ। কুপারের পরিবার কর্নক্ষেতের একটি ফার্মে থাকে, যা “ফিল্ড অব ড্রিমস”-এর শান্ত আইওয়া কৃষকদের মতো লাগে। অবশ্য এই কর্ন মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য, এমন এক পৃথিবীতে যেখানে পরিবেশ এতটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত যে শুরুতে আমেরিকার ১৯৩০-এর দশকের ডাস্ট বোল বলে ভুল হয়। তবু মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন এক গল্পে কর্নকে প্রধান খাদ্য হিসেবে রাখা খানিকটা মজারই বটে।

সবচেয়ে আধুনিক সায়েন্স ফিকশন ভিজ্যুয়ালগুলো এখানে ব্যবহৃত হয়েছে পোস্টকার্ডধর্মী নৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্য। মানুষ কেমন করে বাঁচা উচিত, জীবনে আসল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী। (“আমরা মৃত মানুষকে ভালোবাসি—এর সামাজিক উপকারিতা কী?”, “দুর্ঘটনা হলো বিবর্তনের প্রথম ধাপ।” ) বোঝা যায় যে নোলান ভাইয়েরা এখানে “২০০১: এ স্পেস অডিসি”-র মতো বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী সিনেমা বানাতে চাননি। বরং সায়েন্স ফিকশন কেবল একটি আবরণের মতো—ভেতরে আছে মানবজাতির প্রাথমিক চাহিদা (বাড়ি, পরিবার, রক্তের ধারাবাহিকতা), আর শোকের গল্প—প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা, হোক সেটা মৃত্যু, অসুখ বা দুরত্বের কারণে।

যদিও “ইন্টারস্টেলার” সম্পূর্ণভাবে অলৌকিক বা অযৌক্তিক কোনো জগতে প্রবেশ করেনি, তবু এতে এক ধরনের মরমী ধারা আছে যা নোলানের মতো যুক্তিবাদী গল্পকারের জন্য অস্বাভাবিক। এখানে ধুলো দিয়ে বার্তা লেখে এক “ভূত”। দূরের রেডিও সিগন্যালগুলো পড়া হয় প্রাচীন মৃত ভাষার মতো। কেউ কেউ বছরের পর বছর আগের ভিডিও দেখে চোখ লাল করে ফেলে—যেন তারা সেই মুহূর্তে প্রিয়জনের কাছে ফিরে গেছে। এক নারী বাবার স্মৃতিতে তাড়িত, আরেক নারী প্রিয়জনের থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে।

নোলানের অন্য যে কোনো ছবির চেয়ে এখানে শোক, বিশ্বাস ও অনুভূতির ওপর জোর বেশি। সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর অনেকগুলোই কাহিনি এগিয়ে নেওয়ার জন্য নয় বরং চরিত্রদের কাজের মানে নিয়ে ভাবার জন্য। এর মধ্যে সেরা হলো উৎক্ষেপণ দৃশ্য—যেখানে কুপার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে, সেই দৃশ্যের সঙ্গে মহাকাশযান ছাড়ার মুহূর্ত মিলিয়ে গেছে। মাইকেল কেইন পড়ছেন ডিলান থমাসের কবিতা “Do Not Go Gentle Into that Good Night”—“Rage, rage against the dying of the light।”

চলচ্চিত্রের প্রশস্ত ভিজ্যুয়ালগুলোতে দেখা যায় কঠোর গ্রহপৃষ্ঠ, বিশাল স্টারশিপ মডেল, আর মহাকাশের নীরবতা—যা “২০০১”-এর বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা মেনে তৈরি। কিন্তু সব প্রযুক্তিগত ঝলকের পরও “ইন্টারস্টেলার”-এর আছে পুরনো দিনের সিনেমার মনোভাব, একই সঙ্গে অনেক কিছু হওয়ার চেষ্টা। অ্যাকশন, কৌতুক, ব্যাখ্যামূলক সংলাপ, মনমুগ্ধকর দৃশ্য, আর নীরব, সাদাকালো-টোনের আবেগময় মুহূর্ত—সব মিলিয়ে যেন স্টিভেন স্পিলবার্গের পুরোনো দিনের ছবি।

ম্যাককনাহে এই ধরনের ছবির জন্য সঠিক নায়ক। কুপার নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার, মহাকাশচারী ও কৃষক হিসেবে পরিচয় দিলেও, তার ভেতরে এক রোমান্টিক কবি আছে। মেয়ে মার্ফকে (শিশু বয়সে ম্যাকেনজি ফয়) বিদায় জানানোর দৃশ্য উষ্ণ আলোয় ভরা, যেন “টু কিল আ মকিংবার্ড”-এর বারান্দার দোলনার মুহূর্ত। বড় হয়ে মার্ফ (জেসিকা চ্যাস্টেইন) হয়ে ওঠে নাসার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তবু সেই বিদায়ের মুহূর্তের বেদনা যেন সবকিছুর চালিকাশক্তি।

চলচ্চিত্রের গল্প বলার সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে আপেক্ষিকতার নিয়ম থেকে, মহাকাশচারীদের সময় অনুভূতি ভিন্ন, ফলে কিছু জায়গায় কয়েক মিনিটই পৃথিবীতে বছরের সমান। আর পৃথিবীতে এই সময়ে মানুষ বুড়িয়ে যাচ্ছে, আশা হারাচ্ছে। এখানে সময়ই সবকিছু যা আমরা সবাই ভয় পাই। প্রতিটি কাজ একপ্রকার প্রতিরোধ, যেন বলা হচ্ছে আমরা সহজে হার মানব না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন