আমেরিকান সাহিত্যিক ডন ডেলিলো তার লেখায় কন্সপিরেসি থিমকে একাধিকভাবে অনুসন্ধান করেছেন। বিশেষ করে তার Libra এবং Underworld উপন্যাসে তিনি আমেরিকান সমাজে ষড়যন্ত্রের ধারণা এবং এর বহুমুখী প্রতিফলন নিয়ে আলোচনা করেছেন। ডেলিলোর মতে, আমেরিকানরা “সবত্রই ষড়যন্ত্র দেখতে পায়” কারণ তারা একটি বিশাল এবং জটিল সামাজিক কাঠামোতে বসবাস করে, যেখানে প্রতিটি ঘটনা বা তথ্যের মধ্যে লুকানো কিছু উদ্দেশ্য বা অজানা শক্তির প্রভাব খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। ডেলিলোর মতে, আমেরিকানদের মধ্যে ষড়যন্ত্রের প্রতি আগ্রহের মূল কারণ হল আধুনিক সমাজের অত্যন্ত জটিলতা। একদিকে যেখানে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, এবং প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে অন্যদিকে এই পরিবর্তনগুলো মানুষের সাধারণ অনুভূতির সাথে মানিয়ে নিতে খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশেষ করে ১৯৬০-৭০ দশকে, আমেরিকায় একইসাথে একাধিক বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটেছিল।যেগুলো জনগণের মনে গভীর সন্দেহ এবং আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। JFK হত্যাকাণ্ড, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি, এবং সিআইএ’র গোপন অপারেশনগুলি ক্রমশ এই ষড়যন্ত্রের ধারণার জন্ম দিয়েছিল। এই ঘটনাগুলি মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করেছিল যে সরকার, রাজনীতি, এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা কার্যকলাপ গোপন রাখে এবং মানুষকে অজ্ঞ রাখতে চায়।
ডেলিলো তার লেখায় আধুনিক মিডিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে এক গভীর আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, মিডিয়া ষড়যন্ত্রের ধারণাকে বাড়িয়ে তোলে এবং জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। ২০শ শতকে টেলিভিশন, রেডিও এবং পরে ইন্টারনেটের বিস্তার ঘটার ফলে, মানুষের কাছে তথ্যের প্রবাহ একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি এর সত্যতা বা নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। একটি বিশেষ তথ্যের পেছনে কতটা প্রভাবশালী শক্তি কাজ করছে, তা নিয়ে নানান মতামত উঠে এসেছে। ডেলিলো তার উপন্যাস White Noise এ এটিই তুলে ধরেছেন যে, যখন মানুষ স্রেফ তথ্যের বন্যায় ডুবে যায়, তখন তা তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বা তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয় না, বরং তারা একটি বিভ্রান্তিকর বাস্তবতা তৈরি করে ফেলে, যেখানে প্রতিটি সংবাদ বা ঘটনাকেই এক একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
ডেলিলো আরও বলেন, ষড়যন্ত্রের ধারণা একটি মানসিক অবস্থা হিসেবে দেখা উচিত। আমেরিকান সমাজে একদিকে রয়েছে মুক্তবাজারের ধারণা, যেখানে সবকিছুই প্রকাশ্যে এবং দৃশ্যমান হওয়া উচিত। অন্যদিকে আবার সেই একই সমাজে গোপনীয়তা এবং সরকারি কৌশলের প্রতি বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। মানুষের মনে এটি বিশ্বাস গড়ে উঠেছে যে, তাহলে যেকোনো কিছু যেগুলো প্রকাশ্যে আসে, তার পেছনে কোনো গোপন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এই মানসিকতা আমেরিকান সমাজের মধ্যে একটি গভীর অস্থিরতা তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি বড় ঘটনা বা পরিবর্তনের পেছনে একটি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খোঁজা হয়।
লি হ্যাভি অসওয়াল্ডের জীবন নিয়ে লেখা ডেলিলোর উপন্যাস Libra, ষড়যন্ত্রের ধারণাকে একটি কাল্পনিক রূপে তুলে ধরে। এখানে অসওয়াল্ডের জ্ঞানবিকৃতির মাধ্যমে ডেলিলো দেখাতে চেয়েছেন যে, ষড়যন্ত্রের তত্ত্বগুলি মাঝে মাঝে বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষের নিজস্ব মানসিক অবস্থা এবং পরিপ্রেক্ষিত দ্বারা প্রভাবিত হয়। উপন্যাসে অসওয়াল্ডের কর্মকাণ্ডের পেছনে কয়েকটি গোপন শক্তি কাজ করলেও ডেলিলো যে কথা বলতে চান তা হলো, কখনো কখনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্বগুলি আমাদের নিজেদের অস্থিরতা এবং ভয় থেকে উৎপন্ন হয় এবং আমাদের সত্যিকার উদ্দেশ্য থেকে দূরে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে Underworld উপন্যাসেও আমেরিকান সমাজে ষড়যন্ত্রের ধারণার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ডেলিলো এখানে আধুনিক আমেরিকান জীবন এবং তার মধ্যে চলমান গোপন কর্মকাণ্ড এবং রহস্যময়তা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, ষড়যন্ত্রের ধারণা শুধু বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সম্পর্কিত নয়, এখন এটি দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেলিলো আমাদের সমাজে কন্সপিরেসি থিওরির বিস্তারকে একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যেখানে মানুষের কাছে তথ্যের অভাব এবং তথ্যের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের অস্থিরতা এবং সন্দেহের মধ্যে ঠেলে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তি, মিডিয়া, এবং রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে ঘটে যাওয়া গোপনীয়তা এবং বিভ্রান্তি এ ধারণাকে আরও জোরদার করে তোলে। ডেলিলো যে সংকটটি তুলে ধরেন তা হলো, আমরা যতই তথ্য সংগ্রহ করি, ততই আমরা সত্য থেকে আরও দূরে সরে যাই।


