জেমস জয়েসের ইউলিসিস (Ulysses) আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম জটিল ও বিস্ময়কর উপন্যাস। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই বইটি শুধুমাত্র তার বিমূর্ত ভাষা ও নিরীক্ষামূলক গদ্যের জন্য বিখ্যাত নয় বরং এর ব্যতিক্রমী আখ্যানশৈলীর জন্যও আলোচিত। উপন্যাসটি হোমারের ওডিসি মহাকাব্যের পুনর্নিমাণ, যেখানে ডাবলিন শহরের একদিনের ঘটনাকে কেন্দ্রীয় কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।ইউলিসিস প্রথমবার প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জয়েসের জন্মদিনে। বইটি প্রকাশের পরপরই এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং কিছু দেশে নিষিদ্ধও করা হয়। তবে পরবর্তীকালে এটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বইটির কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং প্রতিটি অধ্যায় ভিন্ন ভিন্ন শৈলী ও দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে। এটি মূলত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত। প্রথম তিনটি অধ্যায় টেলিমেকিয়া। স্টিফেন ডেডালাসের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, যেখানে তার আত্মঅনুসন্ধান ও অস্তিত্বের সংকট উঠে আসে। ওডিসিয়া হচ্ছে পরবর্তী বারোটি অধ্যায়। লিওপোল্ড ব্লুমের দৃষ্টিকোণ, যেখানে তার দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিক ও অভিজ্ঞতা উঠে আসে। শেষ তিনটি অধ্যায় নস্টোস। যেখানে ব্লুম ও স্টিফেন একত্রিত হয় এবং শেষ অধ্যায়ে মলি ব্লুমের বিখ্যাত মনোলগ রয়েছে।
ইউলিসিস পড়া সহজ নয়, তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করলে এটি উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। প্রাথমিক ধারণা তৈরি জয়েসের জীবন, তার সাহিত্যকর্ম এবং বিশেষ করে উলিসিস সম্পর্কে কিছু পড়া ভালো। হোমারের ওডিসি সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলে উপন্যাসটি বোঝা সহজ হয়। এছাড়াও জয়েসের পূর্ববর্তী উপন্যাস A Portrait of the Artist as a Young Man পড়লে স্টিফেন ডেডালাস চরিত্রটি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। জয়েসের ভাষা জটিল, অনেক সময় তিনি চেতনার প্রবাহ (Stream of Consciousness) শৈলীতে লেখেন, যা সাধারণ গল্প বলার ধারা থেকে আলাদা। বইটি পড়তে সময় নিন এবং শব্দার্থ বুঝতে চেষ্টা করুন। অনেক ক্ষেত্রে বাক্যগঠন জটিল এবং দীর্ঘ হওয়ার কারণে পড়ার গতি ধীর হতে পারে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো একাধিকবার পড়া দরকার।
সাহায্যকারী উপকরণ হিসেবে অনেক পাঠক The New Bloomsday Book ev Ulysses Annotated বই ব্যবহার করেন। এগুলোতে প্রতিটি অধ্যায়ের ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স দেয়া থাকে। SparkNotes বা অন্যান্য অনলাইন রিসোর্স থেকেও অধ্যায়গুলোর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। উপন্যাসটি ডাবলিন শহরের একদিনের (১৬ জুন, ১৯০৪) ঘটনা নিয়ে গঠিত। প্রধান চরিত্র লিওপোল্ড ব্লুম, তার স্ত্রী মলি ব্লুম এবং তরুণ স্টিফেন ডেডালাসের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ভাবনার প্রবাহই এর মূল বিন্যাস।
বইটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায় হচ্ছে, Telemachus, স্টিফেন ডেডালাসের সকাল ও তার আত্মদর্শন। Nestor, স্টিফেন তার শিষ্যদের পড়ানোর মাধ্যমে জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটায়। Calypso লিওপোল্ড ব্লুমের প্রাত্যহিক জীবন শুরু। Lotus Eaters ব্লুমের অলসতা ও বিলাসী চিন্তাধারা। Hades মৃত্যু ও জীবন নিয়ে গভীর দর্শন। ঈপষড়ঢ়ং রাজনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে আয়ারল্যান্ডের সামাজিক পরিস্থিতি। Nausicaa ব্লুমের কামনা ও রোমান্টিক কল্পনার প্রতিচ্ছবি। আর Circe, এটি স্বপ্নের মতো একটি অধ্যায়, যেখানে চরিত্রদের অবচেতনের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। বইয়ে মলি ব্লুমের বিখ্যাত মনোলগ হচ্ছে Penelope, যা পুরো বইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার।
জয়েস প্রথাগত আখ্যান কাঠামোকে ভেঙে ফেলেছেন, ফলে অনেক সময় সংলাপ ও ভাবনার পার্থক্য বুঝতে সময় লাগতে পারে। এতে ধৈর্য ধরে পড়তে হবে। জয়েসের রচনায় প্রচুর পৌরাণিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক রেফারেন্স রয়েছে, যা বোঝার জন্য বাড়তি গবেষণাও দরকার হতে পারে। ইউলিসিস শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি সাহিত্যিক অভিযান। এটি পড়তে সময়, ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, তবে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তুতি নিয়ে পড়লে পাঠকের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। যারা সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য এটি এক অতুলনীয় সৃষ্টি।


