কোরবানির ঈদ নিঃসন্দেহে মুসলিম সমাজের এক মহাউৎসব। উৎসব মানেই আনন্দ, মিলন, উদারতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রকাশ। কিন্তু এই ঈদ উদযাপনের ছায়ায় একটি সুস্পষ্ট অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসমতা ও বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তবতা। কেবল আনন্দে মশগুল হয়ে থাকলে সেই অসমতার দিকটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
কোরবানির ঈদের অন্যতম ব্যয়বহুল দিক হলো পশু ক্রয়। অনেকেই কোরবানির মূল দর্শন ভুলে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন—কার গরু বড়, কারটা দামি। এই প্রতিযোগিতা শুধু পশুর দামে নয়, প্রদর্শনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাড়ায় প্রতিবেশীদের মধ্যে শুরু হয় তুলনা; কে কত বড় গরু কোরবানি দিয়েছে, শিশুরাও এই প্রতিযোগিতার চাপে ভোগে। এই ধরনের সামাজিক চাপ শিশুদের মনোজগতে বৈষম্যের বীজ বপন করে খুব অল্প বয়সেই।
পশুর বাজারে চাহিদা পূরণ করতে দেশে-বিদেশে পশু সরবরাহ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বৈধ আমদানির পাশাপাশি চোরাচালানও রয়েছে, যার ফলে কোরবানির পশুর বাজারে কালোবাজারি ও অনৈতিক অর্থনীতি গজিয়ে ওঠে। অন্যদিকে, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহু কৃষক পরিবার ছোটবেলায় কেনা গরু লালন-পালন করে ঈদের সময় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এটি একদিকে যেমন অর্থনীতির অংশ, অন্যদিকে আত্মনির্ভরতার একটি গল্পও বটে।
কোরবানির ঈদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক হলো চামড়ার বাজার। প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয় অদক্ষ জবাই, সঠিক সংরক্ষণের অভাব এবং কসাইদের প্রশিক্ষণের অভাবে। অথচ এগুলো রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। ভিয়েতনাম যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে ১৯ গুণ বেশি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে, সেখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা ভাবনার খোরাক জোগায়।
ঈদের বাজারেও বৈষম্য তীব্র। ধনী শ্রেণির লোকেরা লাখ টাকার লেহেঙ্গা কিংবা তিন প্রস্থ জামা কিনতে পারেন, যেখানে দরিদ্ররা ফুটপাতের পুরনো জামায় সন্তুষ্ট থাকেন। এমনকি কেউ কেউ নিজে কিছু না কিনে সন্তানের জন্য সামান্য জামা কিনেই ঈদ শেষ করেন। এই বৈষম্য দেখা যায় ঈদের খাবারেও—একপ্লেট সেমাই কিংবা একটি রঙিন চুড়িই হয়তো তাদের একমাত্র উৎসব।
সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যায় কোরবানির মাংস বিতরণের সময়। ধনীরা ঘরের ভেতর পোলাও মাংস খাচ্ছেন, আর বাইরে দরিদ্ররা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে, কখনো মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে। কিছু মানুষ গোশতের অপেক্ষায় আহত হন, কেউ হয়তো পান না কিছুই। এমনকি অনেকে ঈদের পরদিন আবর্জনার স্তূপে খুঁজে ফেরেন ফেলে দেওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ।
সবকিছু মিলিয়ে কোরবানির ঈদের অর্থনীতির ছায়ায় সমাজে অসমতা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। যদিও পুরো বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়, তবু অন্তত এর নগ্ন প্রকাশ রোধে আমাদের সংবেদনশীল হওয়া জরুরি। ঈদের মূল আত্মা যদি সত্যিই ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি হয়, তাহলে উৎসব যেন কাউকে ছোট না করে, কাউকে অসম্মান না করে। আমরা শুরুটা করতে পারি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন থেকে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই হতে পারে ঈদের প্রকৃত শিক্ষা।


