সোমদীপ সেন
রস্কিল্ড ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নের
সহযোগী অধ্যাপক
“ইলন মাস্ক এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবসায়ী নন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও একটি বিতর্কিত চরিত্র হয়ে উঠেছেন।…তবে মাস্কের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি কট্টর ডানপন্থী ট্রাম্প ও তাঁর মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলনকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছেন। তিনি এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তিনি চরম ডানপন্থী মতাদর্শ উসকে দিচ্ছেন এবং যুক্তরাজ্যে তাঁর অনুগত উগ্রপন্থী নেতাদের ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করছেন।
গত এক বছরে মাস্ক যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী ব্যক্তিদের (যেমন টমি রবিনসন ও নাইজেল ফারাজ) বারবার সমর্থন দিয়েছেন। জানুয়ারির শুরুতে তিনি আবারও ‘ফ্রি টমি রবিনসন!’ লিখে টুইট করেন এবং রবিনসনের বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘সাইলেন্সড্’-এর লিংক শেয়ার করেন। ওই তথ্যচিত্রে রবিনসন ভুলভাবে দাবি করেন, সিরীয় শরণার্থী কিশোর জামাল হিজাজি ইংরেজ স্কুলছাত্রীদের আক্রমণ করেছিল এবং এক সহপাঠীকে ছুরিকাঘাতের হুমকি দিয়েছিল। … তিনি এ ঘটনাকে ব্যবহার করে প্রচার করতে চান, পশ্চিমা দেশে ব্যাপক অভিবাসন নারীদের জন্য হুমকি। এ ধারণা ব্রিটেনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর মাস্ক সেটাকেই কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন।
ট্রাম্পের প্রথম দফার শাসনামলে, তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ তদন্তের কারণে আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। গত মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ভোট দেয়, তবে সেই বিল সিনেটে আটকে যায়। আইসিসি ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে আদালতের স্টাফদের পাশে থাকা এবং বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সদস্য দেশগুলোকে এই নিষেধাজ্ঞা রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আইসিসি বলেছে, “ট্রাম্পের পদক্ষেপ এই আদালতের স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন বিচারকাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করারই চেষ্টা।”
গত গ্রীষ্মে এক রুয়ান্ডান বংশোদ্ভূত ব্যক্তি তিনজন ব্রিটিশ কিশোরীকে হত্যার পর যুক্তরাজ্যে সহিংস অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তবে আসল উত্তেজনা তৈরি হয় মিথ্যা প্রচারের কারণে, যেখানে কট্টর ডানপন্থীরা, বিশেষ করে টমি রবিনসন, ভুল তথ্য ছড়িয়ে দাবি করেন, হত্যাকারী আল সাকাতি নামের ১৭ বছর বয়সী একজন আশ্রয়প্রার্থী। এ ছাড়া ব্রিটেনে এক দশক ধরে আলোচিত ‘গ্রুমিং গ্যাং স্ক্যান্ডাল’কেও (এমন একটি প্রচারণা যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষেরা শ্বেতাঙ্গ কিশোরীদের নিপীড়ন করেছে) মাস্ক ও কট্টর ডানপন্থীরা বর্ণবাদী ও অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার জন্য ব্যবহার করছেন।
… মাস্ক তাঁর বিশ্বব্যাপী কট্টর ডানপন্থা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জার্মানিতেও হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি দেশটির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) প্রকাশ্য সমর্থক হয়েছেন।…তিনি বলেন, অভিবাসন সীমিত করার মাধ্যমে দলটি দেশকে নিরাপদ রাখতে ও জার্মান সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারবে। ট্রাম্প কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানে ভূমিকা রাখছেন। তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে মাস্কও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া মাস্ক প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেয়ির প্রশংসা করেছেন। মিলেয়ির কঠোর অর্থনৈতিক নীতিগুলো তার ‘ডজ’ নীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
… মাস্কের ডানপন্থী প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে তিনি কোনো মন্তব্য না করলেও কিছু দেশে তা প্রভাব ফেলছে। পোল্যান্ডে এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটার মাস্ক-সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। এটি ঠিক, মাস্কের বৈশ্বিক ডানপন্থী বিপ্লবের প্রচেষ্টা এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। তাঁর কিছু পদক্ষেপ সফল হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তিনি হয়তো যে রকম প্রভাব চাচ্ছেন, তা না-ও হতে পারে। তবে এটি চিন্তার বিষয় যে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে মাস্ক অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।”


