ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে তাদের আঞ্চলিক শত্রু ইরান দুর্বল এবং অপমানিত হয়েছে। আগামী মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অঞ্চলে ইসরায়েলের এজেন্ডা আরও এগিয়ে নিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন।
আসাদের ক্ষমতাচ্যুতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে ব্রিটেনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক লিনা খতিব লিখেছেন, “১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনে যেভাবে ইউরোপে কমিউনিজমের পতন ঘটেছিল, সেভাবে আসাদের পতনে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিম-বিরোধী এবং ইসরায়েল বিরোধী প্রতিরোধের আদর্শের অবসান ঘটেছে। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আসাদ পরিবার মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ছিল, যেখানে একাধিক রাষ্ট্র নিজেদের পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও জায়োনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বলে উপস্থাপন করেছিল।
লিনা খতিব বলেন, এখন মনে হচ্ছে ইসরায়েল ট্রিক ‘মধ্যপ্রাচ্যের এজেন্ডা নির্ধারক’ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল তার দুই ঘনিষ্ঠ শত্রু হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে পরাজিত করেছে। তবে এই সাফল্য অর্জনে তাদের হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করতে হয়েছে। এতে তাদের বিরুদ্ধে গাজা উপত্যকায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে তাদের আঞ্চলিক শত্রু ইরান দুর্বল এবং অপমানিত হয়েছে। আগামী মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অঞ্চলে ইসরায়েলের এজেন্ডা আরও এগিয়ে নিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন।
ইসরায়েলের সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমোস ইয়াডলিন এবং আবনার গোলভ ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে এক লেখায় ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কৌশল তুলে ধরেছেন। তারা সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কুটনৈতিক প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। তবে ইসরায়েলের এই প্রচেষ্টা সফল করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য কিছু ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হবে।
কিন্তু এই চেষ্টা নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের কিছু সদস্যের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। এরা পশ্চিম তীর ও গাজার কিছু অংশ ইসরায়ে-ে লর সঙ্গে যুক্ত করা এবং গাজায় সামরিক শাসন জারি কিংবা এমন অভ্যন্তরীণ নীতির স্বপ্ন দেখেন যা দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করবে।
দ্য গার্ডিয়ানে হাসান লিখেছেন, আসাদের পতন এবং হিজবুল্লাহর দুর্বল অবস্থান ইরানের “শিয়া অর্ধচন্দ্রাকার বলয়’ ভেঙ্গে দিছে। এর ফলে তুরস্কের ‘পূর্ণিমা’ বলয়ের উত্থান ঘটছে. যা আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চল থেকে লেভান্ট এবং আফগানিস্তান পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।
শক্তিশালি আঞ্চলিক রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে তিনি আরও বড় ভূমিকা পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা করেছেন এবং আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্কের মিত্রতা আরও জোরদার করেছেন। আজারবাইজান ইরানের পাশে অবস্থানরত একটি শক্তিশালি তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র।
ইসলামীপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তুরস্কের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব এবং মুসলিম ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা করা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশরসহ আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য এবং ইসরায়েলের জন্যও উদ্বেগের কারণ।
গাজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক এবং ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। ফলে দামেস্কের রাজনৈতিক সংঘাত দ্রুতই ভূরাজনৈি তক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা পেতে পারে।ফিনান্সিয়াল টাইমসের কলামিস্ট গিডিয়ন র্যাচম্যান লিখেছেন, “এরদোয়ান ও নেতানিয়াহুর পরস্পরবিরোধী উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহজেই সিরিয়ায় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। ফলে এটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় দেশগুলোরও সেখানে স্বার্থ জড়িত।”


