ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকট। এ সংকট কেবল ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়, জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় পবিত্রতা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমন্বয়ে গঠিত একটি গভীর সংঘাত। ১৯৩০-এর দশকে বর্তমান ইসরায়েলের গাজা সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে, বিশেষ করে কিবুটস এলাকায় পূর্ব ইউরোপের (বিশেষত পোল্যান্ড) ইহুদিরা কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপন শুরু করে। তখন পাশ্ববর্তী ফিলিস্তিনী আরবরা কয়েক শতাব্দী ধরে ঐ অঞ্চলে কৃষি নির্ভর জীবনযাপন করছিল।প্রাথমিক পর্যায়ে আরব ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক ছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ। কিন্তু ইউরোপীয় ইহুদি অভিবাসনের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে জমির মালিকানা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে।
১৯১৭ সালের ‘বেলফোর ঘোষণা’-র মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানায়। একইসাথে আরবদের প্রতিও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ছিল, যা ঐ অঞ্চলে ব্রিটিশ নীতিকে দ্ব্যর্থবোধক ও স্ববিরোধী করে তোলে। ফলে উভয় সম্প্রদায় নিজেদের জন্য ব্রিটিশ সহায়তা প্রত্যাশা করতে থাকে, যা এক পর্যায়ে দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। ১৯৩৩ সালে নাৎসি জার্মানির উত্থানের পর ইউরোপে ইহুদিদের উপর নিপীড়ন বেড়ে যায়। এর ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আরবরা বুঝতে পারে যে এই অভিবাসন তাদের জনসংখ্যাগত ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। ফলস্বরূপ ১৯৩৬-১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে আরব বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা ব্রিটিশদের কঠোর দমননীতির মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও পরে, ইউরোপীয় ইহুদি গণহত্যা (হলোকাস্ট) আন্তর্জাতিক সহানুভূতির জন্ম দেয়। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১০০,০০০ ইহুদিকে দ্রুত ফিলিস্তিনে পুনর্বাসনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে আরব বিদ্রোহ এবং ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের মধ্যে পড়ে যায়, যার ফলে তারা বাধ্য হয়ে ১৯৪৭ সালে সমস্যাটি জাতিসংঘের হাতে তোলে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ একটি বিভাজন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যেখানে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ইহুদি ও আরব রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য যে ইহুদিরা তখন মোট ভূমির মাত্র ১০% এর মালিক হলেও তাদের ৫৫% জমি বরাদ্দ করা হয়। ফিলিস্তিনী আরবরা এবং আশেপাশের আরব রাষ্ট্রগুলো এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে, সশস্ত্র সংঘাতে প্রস্তুতি নেয়।
১৪ মে ১৯৪৮ সালে ইহুদি নেতারা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। এর এক ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচটি আরব দেশ (মিশর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়া) ইসরায়েল আক্রমণ করে। যদিও সংখ্যাগতভাবে আরব সৈন্যদের শক্তি ছিল তুলনামূলক বেশি হলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমন্বয়ের অভাব এবং ইসরায়েলি সেনাদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত অবস্থা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। একাধিক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে ইসরায়েল তার ভূমি এবং রাজনৈতিক সত্তা নিশ্চিত করে। এ যুদ্ধের ফলে প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনী তাদের নিজ বসতভিটা থেকে উৎখাত হন, যাদের অধিকাংশই আর কখনও ফিরে যেতে পারেননি। ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রপতি শিমন পেরেজের বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনীদের ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ছিল ‘ঐতিহাসিক ভুল’, যা আরব্য বিশ্ব এবং ফিলিস্তিনীদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির অন্যতম কারণ।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট শুধুমাত্র একটি অঞ্চলভিত্তিক সংঘর্ষ নয়, এটি ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এবং সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব। ঐতিহাসিক নিরীক্ষার ভিত্তিতে বুঝা যায়, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রকৃত সমাধান কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং ইতিহাসের স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভিত্তিতেই সম্ভব।


