আমরা কি আমাদের স্মৃতির সংকলন : ডেভিড হিউম, হেনরি বার্গসন ও নিউরোফিলসফি

আত্মপরিচয় কি শুধুই স্মৃতির যোগফল?

“আমি কে?” এই প্রশ্নটি কোনো সাধারণ আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান নয়, বরং গভীরভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের স্মৃতির সঙ্গেও। ভেবে দেখুন, যদি আপনার সমস্ত স্মৃতি মুছে যায়, আপনি কি তখনও ‘আপনি’ থাকবেন?

দার্শনিক ডেভিড হিউম তাঁর Treatise of Human Nature বইতে দাবি করেন, আমরা যখন আত্মপরিচয় খুঁজি, তখন কোনো ‘নিরবিচ্ছিন্ন সত্তা’ খুঁজে পাই না। বরং পাই একগুচ্ছ স্মৃতি, অনুভূতি, চিন্তা ও ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতার প্রবাহ।

হিউম বলেন, “When I enter most intimately into what I call myself, I always stumble on some particular perception…”

অর্থাৎ, আমরা কখনোই একটি স্থির ‘আমি’ খুঁজে পাই না। পাই কেবল আমাদেরই অনেকগুলো পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সারি।

এই ধারনাটি পরবর্তীতে আধুনিক কগনিটিভ সায়েন্সে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে। যখন মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (যা স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ব্যক্তি অতীতের স্মৃতি হারায় এবং একই সঙ্গে তাঁর আত্মপরিচয়ের বোধও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ থেকে বোঝাই যায়, স্মৃতি না থাকলে ব্যক্তি ‘আমি’ বোধও হারাতে পারেন।

ফরাসি দার্শনিক অ্যঁরি বার্গসনের মতে, স্মৃতি শুধুই মস্তিষ্কের জৈব প্রক্রিয়া নয়। এটি সময়ের একটি অভ্যন্তরীণ গঠন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Matter and Memory-তে তিনি বলেন, “স্মৃতি হচ্ছে অতীতের এমন এক চেতনা, যা সময়কে জীবিত রাখে।” তাঁর মতে আমাদের মানসিক অস্তিত্ব গঠিত হয় একটি প্রবাহমান ধারায়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তই পূর্ববর্তী স্মৃতিকে ধারণ করে।

বার্গসনের দর্শনে স্মৃতি কেবল অতীতের রেকর্ড নয়, বরং বর্তমান অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন। যেমন ধরুন, একটি নির্দিষ্ট গানের সুর আপনাকে হঠাৎই স্কুলজীবনের কোনো দৃশ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই রকম সক্রিয় পুনরাবৃত্তি সময় ও চেতনার সংবেদনশীল যোগসূত্রকে নির্দেশ করে।

আধুনিক নিউরোসায়েন্স ও দর্শনের সংযোগস্থল নিউরোফিলসফি এই প্রশ্নটি ঘুরিয়ে তোলে। “আমাদের আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতা কি নিউরোনের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফল?” মার্কিন দার্শনিক প্যাট্রিসিয়া চার্চল্যান্ড বা টমাস মেটজিঙ্গার বলেন, আত্মচেতনা মূলত মস্তিষ্কের একটি “ইন্টারনাল মডেল”, এক ধরনের সমন্বিত তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা যা আমাদের মনে করিয়ে তোলে “আমি আছি”।
তবে সমস্যা হলো, আত্মসচেতনতা কেবল তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ নয়। এটি আবেগ, ইচ্ছা, নৈতিকতা ও স্মৃতির সংমিশ্রণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালঝেইমার রোগীরা ধীরে ধীরে তাদের স্মৃতি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আত্মপরিচয়ের বোধও হারিয়ে ফেলেন। তাই প্রশ্ন উঠে যদি স্মৃতি আমাদের আত্মপরিচয়ের শিকড় হয়, তবে স্মৃতি কি আমাদের সত্তার একমাত্র আধার?

সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা বলেন, আত্মপরিচয়ও একটি নির্মাণ (construction)। অর্থাৎ, আমরা কেবল স্মৃতি রাখি না, বরং স্মৃতিকে আরো সাজিয়ে তুলে ধরি। আমরা এমন গল্প তৈরি করি, যা আমাদের ‘আমি’-কে অর্থ দেয়। এটিকে বলা হয় “narrative identity” অর্থাৎ, জীবনকে একগুচ্ছ ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি অর্থপূর্ণ ধারাবাহিক কাহিনি হিসেবে দেখার প্রবণতা।

আপনি যদি নিজেকে বলেন, “আমি সব সময় একা ছিলাম, কারও ভালোবাসা পাইনি,” তখন আপনি হয়তো আপনার একাকীত্বের স্মৃতিগুলোই বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে কেউ হয়তো একই জীবনকে বলে, “আমি শক্তিশালী হয়েছি কারণ আমি নিজের চেষ্টায় বড় হয়েছি।” অর্থাৎ, স্মৃতি শুধু ঘটনা নয়, সেটি নির্বাচিত ও পুনর্গঠিত অভিজ্ঞতাও।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের স্মৃতি প্রায়ই বিকৃত হয়, মিশ্রিত হয় কল্পনার সঙ্গে, এমনকি এমন কিছুও তৈরি হয় যা ঘটেইনি। এই মিথ্যা স্মৃতি (false memory) কখনো এমনও হয় যে মানুষ অপরাধ স্বীকার করে যা সে করে নি।
এবার প্রশ্ন আসে, যদি আমাদের আত্মপরিচয় এইসব বিকৃত স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই পরিচয় কতটা নির্ভরযোগ্য? আমরা কি নিজের কল্পনারও শিকার?

যদি আত্মচেতনা নিছক নিউরনের খেলা হয়, যদি স্মৃতি মিথ্যা হতে পারে, এবং যদি আমরা গল্প বলেই নিজের পরিচয় তৈরি করি, তবে সত্যিকারের ‘আমি’ কোথায়?
এই প্রশ্নই আমাদের ঠেলে দেয় দার্শনিক দ্বিধার দিকে, আত্মা কি তবে নেই? নাকি মস্তিষ্কের বাইরে কোনো অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব আছে যা চেতনার ধারক?
এইখানেই বহু দার্শনিক যেমন কার্টেসিয়ান দ্বৈতবাদ (Descartes’ mind-body dualism) আবার কেউ কেউ প্যানসাইকিজম বা non-reductive physicalism-এর দিকে তাকিয়ে বলেন, “চেতনা হয়তো বস্তুর বাইরেও কিছু।”

আমরা যদি আত্মপরিচয়কে স্মৃতির সংকলন বলি, তাহলে সেটা যথেষ্ট নয়। স্মৃতি আমাদের অস্তিত্ব গঠনে অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু সেটা কেবল তথ্য নয় একটি জীবন্ত, পুনর্গঠিত ও বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা। হিউম আমাদের দেখালেন আত্মপরিচয়ের অসারতা, বার্গসন দেখালেন সময়ের গভীর প্রবাহ, আর নিউরোফিলসফি আমাদের স্মৃতির জৈব-নির্মাণ।

তবে এর বাইরে আছে আরেকটি দার্শনিক স্তর, আমরা নিজের ভেতরে যে প্রশ্ন জাগাই, তার উত্তর সবসময় মস্তিষ্ক দিতে পারে না। আত্মপরিচয় হয়তো স্মৃতির সমষ্টি, কিন্তু সেটি কেবল ‘তথ্য’ নয় একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতারও ইতিহাস।

তাহলে উত্তর কী? আমরা কি আমাদের স্মৃতিরই সংকলন? হ্যাঁ, অনেকটা। তবে আমরা শুধু স্মৃতির গাঁথুনি নই, আমরা সেই গল্পেরও নির্মাতা, যে গল্পে আমরা নিজ্টাদের চেনার চেষ্টা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন