আফ্রিকান নির্জন অঞ্চলের প্রাণীভাষী মানুষ ‘ডোজার’

আফ্রিকার নির্জন কিছু অঞ্চলে আজও এক বিস্ময়কর বিশ্বাস বেঁচে আছে, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে যোগাযোগ সম্ভব, যদি কেউ ‘ডোজার’ হয়ে জন্মায়। এই ধারণা শুনতে যতটা অতিপ্রাকৃত মনে হয় ততটাই তা ঐ অঞ্চলের বাস্তবতা ও সংস্কৃতির অংশ। “ডোজার” শব্দটি পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকার কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু মানুষ বোঝাতে, যারা পশুপাখির ‘মনের ভাষা’ বুঝতে সক্ষম।

প্রথমে শোনার পরেই প্রশ্ন জাগে, এ কি নিছক লোককথা, না কি সত্যিই আছে কোনো নিখুঁত সংবেদনক্ষমতা, যা মানুষকে অন্য প্রাণীর আবেগ বা সংকেত বোঝার বিশেষ ক্ষমতা দেয়? ডোজারদের সম্পর্কে বিশ্বাস জন্মায় একধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে। বলা হয় এরা পাখির চিৎকার শুনে আগাম জানিয়ে দিতে পারে জঙ্গলে শিকারি এসেছে কি না। কখনো কোনো সাপ বা হায়েনার উপস্থিতি শনাক্ত করে শুধু আশেপাশের প্রাণীদের গতিবিধি দেখে। অনেকে বলেন, তারা পশুদের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে, পশুটি নিজে যা ভাবছে, সেই মানসিক প্রতিচ্ছবিই তাদের মধ্যে প্রবেশ করে।

আধুনিক ভাষায় কেউ কেউ এটিকে ‘bio-empathic resonance’ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। যেমন আমরা কোনো মায়ের চোখ দেখে বুঝি তার সন্তান বিপদে আছে, হয়তো এই ডোজাররা প্রাণীদের মধ্যে সে ধরনের না-দেখা সঙ্কেত শনাক্ত করে নিতে পারে। কিন্তু এখানেই রহস্য ঘনীভূত হয়। কেননা শুধু সংবেদন নয়, এই ডোজাররা একধরনের ‘dialogic’ সংযোগ দাবি করে—যেখানে তারা বোঝে, আবার প্রতিক্রিয়াও জানায়। অর্থাৎ পাখি ডেকে কিছু বললে, ডোজার প্রতিউত্তর দেয় নীরব ভাষায়, দৃষ্টিতে, এমনকি হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকা ভঙ্গিতে।

এই ধারণা শুধু বিচ্ছিন্ন বিশ্বাস নয়, প্রথাগত এক শিক্ষাব্যবস্থাও আছে কিছু অঞ্চলে। শিশুদের নির্জন বনে বসিয়ে নিরবতা শেখানো হয়, প্রাণীদের শরীরী ভাষা পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়। এ এক ধরণের প্রাকৃতিক দীক্ষা। আর যাদের মধ্যে এই সংযোগ গাঢ় হয়, তাদেরকেই স্বীকৃতি দেয়া হয় ডোজার হিসেবে।

বিশ্বাস আছে এ ক্ষমতা পাওয়া যায় শুধু জন্মসূত্রে, শিক্ষা দিয়ে নয়। একজন ডোজার তার জীবনসঙ্গী নির্বাচন পর্যন্ত করে পশুপাখিদের সংকেত দেখে এমনকি মৃত ব্যক্তির আত্মা কখন কোথায় আশ্রয় নেয়, তাও সে বুঝতে পারে বলে দাবি করা হয়।

কিন্তু এই বিশ্বাসের মধ্যেই আছে একধরনের অস্বস্তিকর দিক। অনেক সময় যারা ডোজার বলে পরিচিত, তারা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে। কারণ তাদের মাঝে অলৌকিক কিছু আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কেউ কেউ মনে করে, তারা মানুষের চেয়ে পশুর কাছেই বেশি অনুগত। কেউ কেউ আবার ভাবে এরা নরবলি বা অরণ্যদেবতার দূত, একটি অদৃশ্য ভয় তাদের ঘিরে রাখে।

আফ্রিকার উপনিবেশকালীন সময়েও ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা ডোজারদের খোঁজ পেয়েছিল। কিছু গবেষণাপত্রে উল্লেখ আছে এক ফরাসি নৃবিজ্ঞানী ১৯২০ সালের দিকে একটি উপজাতির মধ্যে এমন এক বালকের কথা শুনেছিলেন, যে হঠাৎ করে বনভূমির গভীরে চলে যেত, আর ফিরে এসে বলত—“জঙ্গলের মানুষ এসেছে”—এবং আশ্চর্যজনকভাবে কিছুক্ষণ পরই হানা দিত দস্যুরা। সেই নৃবিজ্ঞানী লেখেন, “সে ছেলেটি শুধু পাখিদের কলতান শুনেই আগাম বিপদের আভাস দিতে পারত।”

আজকের আধুনিক মন এইসব গল্পে সংশয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু যেসব সমাজে ভাষা ও বিজ্ঞানের জোর কম, সেখানে পর্যবেক্ষণ ও অনুভবই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি। ডোজারদের প্রতি বিশ্বাস এমন এক প্রাকৃতিক-মানবিক সম্পর্কের প্রতিফলন, যা পশ্চিমা যুক্তিবাদে ব্যাখ্যাতীত।

সাম্প্রতিক কিছু নৃবিজ্ঞানী এবং আচরণবিদরা একে ‘প্যারাল্যাংগুয়েজ’ বা প্রকৃতির সঙ্গে বিকল্প ভাষাগত সংযোগ বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু তারা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি এই ডোজাররা নিছক বুদ্ধিমান, নাকি সত্যিই তাদের মধ্যে এমন কোনো জন্মগত ক্ষমতা আছে, যা আমরা বুঝতে পারি না।

সাম্প্রতিক গবেষণায় কিছু পাখির শব্দধারা থেকে নির্দিষ্ট সংকেত বের করে আনা হয়েছে। যেমন বিপদ আসছে বা খাবার পাওয়া গেছে। ডোজাররা হয়তো শত বছর আগে থেকেই এগুলো বুঝে ফেলেছিল, শুধু বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলতে পারেনি। তাহলে কি আমরা আজ বিজ্ঞানের পথে ফিরে পাচ্ছি সেই আদিম জ্ঞান?শেষ প্রশ্নটা থেকে যায় ডোজার কি সত্যিই বিদ্যমান, না কি তারা কেবল প্রকৃতি ও কল্পনার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা রহস্যময় মানুষ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন