সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াবের সঙ্গে এক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ড. ইউনূস। এসময় তিনি কীভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন, তার বর্ণনা করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষ দিকের সময়ের বর্ণনা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এখানে ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, কোনও পরিকল্পনা ছিল না। কেউ কোনও প্ল্যান করছিল না, কোনও নেতৃত্ব ছিল না। যেকোনও আন্দোলনে একজন নেতৃত্ব থাকে, কিন্তু এখানে তেমন কিছু ছিল না। কোনও দিক-নির্দেশনা ছিল না।’
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদল চলাকালীন একটি অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস ছাত্র আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ বলেছিলেন এবং মাহফুজ আলমকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘একজন ছাত্র গুলি খেয়ে তার বন্ধুদের কোলে পড়ে গেছে এমন দৃশ্য পুরো দেশবাসী দেখেছে, তারপর থেকে প্রেক্ষাপট পাল্টে গেলো। এরপর শুধু তরুণরা না, বাসায় থাকা সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। তাতে এটি জনগণের আন্দোলনে পরিণত হলো। হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে পদযাত্রা শুরু করলো। সবাই সিদ্ধান্ত নিলো যে তাকে আর ক্ষমতায় রাখা যাবে না। ৫ আগস্ট তিনি উড়াল দিলেন।’
‘আপনারা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লবের কথা শোনেন। এই ঘটনা সবগুলো থেকে আলাদা। খুবই স্বকীয়তা ছিল এই ঘটনায় এবং তা এসেছে তরুণদের কাছ থেকে’, বলেন প্রধান উপদেষ্টা। ড. ইউনূস বর্ণনা করেন, ‘বাংলাদেশে গত জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের ইস্যু খুবই সাধারণ ছিল। কর্মসংস্থান চাওয়া হচ্ছিল, সবার জন্য সমান সুযোগের দাবি করা হচ্ছিল, চাকরিতে কারও জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার বিরুদ্ধে ছিল এই আন্দোলন। সরকার এবং ছাত্রদের মুখোমুখি অবস্থায় একটি কঠিন পরিস্থিতির তৈরি হলো। সরকার ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো শুরু করলো। এই ঘটনা পুরো প্রেক্ষাপট পাল্টে দিলো।
ছাত্ররা এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলো, অস্ত্রের সামনে নিজেদের বিলিয়ে দিলো। কোনও অবস্থাতেই পথ ছেড়ে গেলো না। তখন থেকেই তা হয়ে গেলো অপ্রতিরোধ্য। তরুণরা সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হয়ে আন্দোলনে গেলো নিজেদের কাছ থেকে নিজেরাই বিদায় নিয়ে, হয়তো তারা ফিরে নাও আসতে পারে। এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছিল।
যখন গুলিবর্ষণ চলছিল, ছাত্ররা পিছু হটছিল না। যারা গুলি খেয়েছে, তারা পড়ে গেছে রাস্তায়। পেছন থেকে আরেক দল এসে দাঁড়িয়ে গেছে। এরকম বেশ কিছুদিন ধরে হয়েছে। তারপর এক পর্যায়ে ছাত্ররা ডাক দিলো যে, এই সরকারকে বিদায় নিতে হবে। সবদিক থেকে জনগণ এবং ছাত্রদের একটা স্রোেত চলে আসলো ঢাকায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ছাত্ররা হঠাৎ ঢাকার দেওয়ালে আঁকাআঁকি শুরু করলো। পুরো ঢাকার দেওয়াল ভরে গেলো। তাদের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা সব কিছু দেয়াল চিত্রে তুলে ধরলো।’


