সংস্কারের জন্য গঠিত পাঁচ কমিশনের ১৬৬ সুপারিশের মধ্যে– আনুপাতিক ভোটে উচ্চকক্ষ ও এনসিসি গঠন বড় পরিবর্তন। ঐকমত্য কমিশন সূত্র সমকালকে বলেছে, সংবিধানকে সুরক্ষা দিতে আনুপাতিক ভোটে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন এবং সংবিধান সংশোধনে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন ও গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বাদে বাকি সব কাজ রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে বাধ্য। এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ স্বতন্ত্র আইনের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে আদতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
এ একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, উচ্চ ও নিম্নকক্ষের স্পিকার, বিরোধী দল থেকে উচ্চ ও নিম্নকক্ষে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার বাইরে দল থেকে একজন করে সংসদ সদস্য নিয়ে ৯ সদস্যের এনসিসি গঠনের সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। সুপারিশ অনুযায়ী – এনসিসি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেল, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, স্থানীয় সরকার কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সমস্ত নষ্ট হয়এবং তিন বাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ করা হবে। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও নিয়োগ হবে এনসিসির মাধ্যমে।
সাধারণ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে সংসদের উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ও গণভোট এবং জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনে শক্ত আপত্তি আছে বিএনপির। তারা এ বিষয়ে কোনো আপসও করবে না। বিএনপি মনে করছে, ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বাধ্যতামূলক করা হলে নির্বাচিত সংসদের ক্ষমতা কমে যাবে। আবার সংবিধানের যে কোনো সংশোধনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক হলে সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় উচ্চকক্ষের প্রস্তাব রয়েছে। দলটির সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি চায় বিদ্যমান পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে যেভাবে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়, উচ্চকক্ষের আসনও সেভাবে বণ্টিত হবে।বিএনপির আশঙ্কা, এনসিসি গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের ক্ষমতা কমে যাবে। আবার সংসদ ভেঙে দেওয়া অবস্থায় উচ্চ ক্ষমতার এই এনসিসির জবাবদিহির কোনো কাঠামো থাকবে না। আবার নির্বাচনকালীন অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এনসিসি চাইলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করারও সুযোগ থাকবে। অবশ্য ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় এনসিসি কীভাবে কাজ করবে, তা সুপারিশে বিস্তারিত বলা আছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত হবে – এ আশঙ্কা অমূলক।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন – অতীতে কী হয়েছে, তা মাথায় রেখে এত নিয়মকানুন লিখে গণতন্ত্র হয় না। এভাবে স্বৈরাচার রোধ করা যাবে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে যথাযথ চর্চার মাধ্যমে এগোতে হবে। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকতে হবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নেতাদের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এই দুই সুপারিশকে মৌলিক সংস্কার মনে করছে এবং তা সমর্থন করছে। জামায়াতে ইসলামীও আনুপাতিক পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের সুপারিশে একমত। দলটি এনসিসি গঠনেও রাজি। তবে তারা প্রস্তাব করেছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনসিসি বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক কাউন্সিল থাকবে না।


