আধুনিক স্থাপত্যের ঐতিহ্যগত সংকট

বিশ্বের নগরায়নে আধুনিক স্থাপত্যের যে উচ্ছ্বাস ছিল তা আজ অনেকটাই স্তিমিত। ১৯৯০ ও ২০০০ দশকে ‘স্টারকিটেক্ট’ নামে পরিচিত বিখ্যাত স্থপতিরা-যেমন জাহা হাদিদ, হার্জগ ও ডি মিউরন, রেম কুলহাস কিংবা ফ্র্যাঙ্ক গেহরি-নতুন নতুন অদ্ভুত, জটিল এবং কম্পিউটার-নির্ভর ভবনের নকশা করতেন, যেগুলো ছিল স্থানিক ও ঐতিহ্যবিরোধী। কিন্তু আজ সেই প্রবণতা অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিক স্থাপত্যের জাঁকজমক কমে গিয়ে স্থাপত্যে ফিরে এসেছে এক ধরনের সংযম ও ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে এই পরিবর্তন দ্রুততর হয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে নব্য-ধ্রুপদী (neoclassical) স্থাপত্যের পক্ষে যুক্তি উঠে আসে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ক্লাসিকাল’ আর্কিটেকচারের পক্ষে নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেখানে গ্রিক রিভাইভাল, গথিক, জর্জিয়ান ও নব্য-ধ্রুপদী শৈলীর প্রশংসা করা হয়। একইভাবে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ সরকারও নতুন বাসস্থান নির্মাণে ‘বিল্ট বিউটিফুল’ ধারণা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়, যার অর্থ ছিল মূলত ঐতিহ্যবাহী নকশা।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৪ সালে ‘অদ্ভুত স্থাপত্য’ নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেন-যা ছিল জাহা হাদিদের ডিজাইন করা গুয়াংজুর অপেরা হাউস, কুলহাসের বেইজিংয়ের সিসিটিভি হেডকোয়ার্টার বা হার্জগ ও ডি মিউরনের ‘বার্ডস নেস্ট’ অলিম্পিক স্টেডিয়ামের মতো ভবনগুলোর প্রতি ইঙ্গিত। একই সময়ে বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘হুটং’ গলিগুলো পুনরুদ্ধার করে পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

আধুনিক স্থাপত্যের সমালোচকরা বলেন, এই শৈলীর প্রধান সমস্যা হলো ‘প্লেসলেসনেস’-অর্থাৎ স্থান বা পরিবেশের প্রতি অসেনসিটিভনেস। ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টাইল’ নামে পরিচিত আধুনিক স্থাপত্যের একটি ধারা ছিল বিশ্বজুড়ে একই ধরনের ভবন নির্মাণের প্রবণতা, যা স্থানীয় ঐতিহ্য, উপকরণ বা পরিবেশের সঙ্গে সংযোগহীন। স্টিলের ফ্রেম, এয়ার কন্ডিশনিং, এলিভেটর-এসব প্রযুক্তির কারণে স্টুটগার্ট, সিডনি, সিয়াটল, সিউল বা ঢাকায়ও একই ধরনের স্কাইস্ক্র্যাপার গড়ে উঠেছে।

এই সমালোচনার জবাবে ১৯৮০-র দশকে ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ Kenneth Frampton ‘ক্রিটিক্যাল রিজিওনালিজম’-এর ধারণা দেন, যেখানে আধুনিক স্থাপত্যকে স্থান ও উপকরণের প্রতি সংবেদনশীল হতে বলা হয়। আজকের পরিবেশ-সংকট ও কার্বন-নির্ভর নির্মাণ প্রক্রিয়ার আলোকে এই চিন্তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

আজকের স্থাপত্য-আলোচনায় ‘স্টাইল ওয়ার্স’ ফিরে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে প্রকট। একদিকে আছে ঐতিহ্যবাদীরা, যারা গ্রিক-রোমান, রেনেসাঁ বা ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের ছবি শেয়ার করেন এবং আধুনিক স্থাপত্যকে ‘গ্লোবালিজম’-এর নিদর্শন হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে আধুনিকতাবাদীরা ব্রুটালিজম বা পোস্টওয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্টাইলের ভবনের ছবি শেয়ার করেন, যা আবার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

এই দুই পক্ষই মূলত অতীতের প্রতি নস্টালজিক- এক পক্ষ সাম্প্রতিক, অন্যপক্ষ সুদূর অতীতের জন্য। উভয়েই প্রতিপক্ষকে কার্টুনের মতো উপস্থাপন করেন এবং স্থাপত্যকে কেবল চিত্র বা JPEG-এ সীমাবদ্ধ রাখেন। বাস্তবিক অর্থে স্থাপত্যের প্রকৃত সৌন্দর্য অনুভব করা যায় কেবল সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, ছবি দেখে নয়।

আধুনিক স্থাপত্যের আরেকটি বড় সমালোচনা হলো-এর উপকরণ ও নির্মাণপ্রণালী অত্যন্ত কার্বন-নির্ভর ও ব্যয়বহুল। কংক্রিট ও স্টিল-এই দুই উপকরণ আধুনিক স্থাপত্যের ভিত্তি, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অথচ আজকের ‘ঐতিহ্যবাহী’ ভবনও অনেকাংশে একইভাবে কংক্রিট ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড উপকরণে নির্মিত হয়, কেবল বাহ্যিকভাবে ঐতিহ্যবাহী শৈলী ধারণ করে। ফলে স্টাইল হয়ে দাঁড়ায় কেবল এক ধরনের মুখোশ, যার ভেতরে একই ধরনের শিল্পায়িত নির্মাণপ্রক্রিয়া।

স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা এখন অনেক খরচসাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। ফলে, নির্মাণশিল্পে দক্ষ শ্রমিকের অভাব, দ্রুত নির্মাণের চাহিদা ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড প্রযুক্তির কারণে বিশ্বজুড়ে একই ধরনের ভবন গড়ে উঠছে, চেহারায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মূলত একই ধরনের।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ স্পষ্ট। ঢাকার লালবাগ কেল্লা, সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক স্থাপত্য, এবং সিলেটের মসজিদগুলো ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভবনগুলোতে আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী নকশার মিশ্রণ দেখা যায়। পরিবেশবান্ধব নির্মাণে স্থানীয় উপকরণ যেমন বাঁশ, মাটি ও পাথরের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নির্মাণশৈলী গড়ে তোলা গেলে টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বর্তমান সময়ে টেকসই স্থাপত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কার্বন নির্গমন কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার, এবং সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় এই প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো গেলে পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নির্মাণ সম্ভব হবে। নতুন প্রযুক্তি যেমন ৩ডি প্রিন্টিং, স্মার্ট বিল্ডিং সিস্টেম, এবং বায়োফিলিক ডিজাইন স্থাপত্যকে আরও মানবিক ও পরিবেশবান্ধব করে তুলছে।

ঐতিহ্যবাদেরও ‘প্লেসলেসনেস’ আছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সময়, ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী-যেমন ভিক্টোরিয়ান বা জর্জিয়ান-বিশ্বের নানা প্রান্তে হুবহু কপি করে নির্মাণ করেছিল। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড-সবখানেই ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। ফলে, ঐতিহ্যবাদেরও একটি আন্তর্জাতিক, শিল্পায়িত রূপ রয়েছে, যা স্থানিকতা বা স্থানীয়তার সঙ্গে সবসময় সংযুক্ত নয়।

একুশ শতকের স্থাপত্য আজ এক সংকটের মুখে। আধুনিকতাবাদ ও ঐতিহ্যবাদের দ্বন্দ্বে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকরণ, প্রযুক্তি ও টেকসই ভবিষ্যৎ-শুধু সৌন্দর্য বা স্টাইল নয়। স্থাপত্যের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে স্থান, পরিবেশ, স্থানীয় উপকরণ ও টেকসই প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী নির্মাণশৈলী গড়ে তোলা যায়। স্টাইলের দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে, স্থাপত্যকে আবারও মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও সমাজের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন