অ্যান্টোনিও দামাসিও এবং হানা দামাসিও তাঁদের নতুন তত্ত্বে বলছেন, “চেতনামূলক প্রক্রিয়া শুরু হয় অনুভূতির মাধ্যমে, চিন্তা করার মাধ্যমে নয়।” এই ধারণা নতুন। কারণ সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হতো যে চিন্তা ও যুক্তি হলো চেতনার মূল, কিন্তু দামাসিওরা বলছেন অনুভূতিই হলো চেতনার মূল উৎস। অনুভূতি ছাড়া চেতনা অসম্ভব এবং এটি চেতনার ‘হার্ড প্রবলেম’ বা কঠিন সমস্যা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যতের জন্য গভীর প্রতিফলন ঘটায়।
অনুভূতিই চেতনার উৎস, যা আমাদের বর্তমান শারীরিক অবস্থার সচেতন জ্ঞান প্রদান করে। এটি আমাদের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, যন্ত্রণার অনুভূতির মাধ্যমে আমরা সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি বা তৃষ্ণার অনুভূতির মাধ্যমে পানি খেতে পারি। অনুভূতিগুলির উপস্থিতি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অবিরত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে এবং আমাদের মস্তিষ্ককে জীবনের প্রক্রিয়াকে অভ্যন্তরীণ অনুভূতির মাধ্যমে অনুভব করতে সাহায্য করে। দামাসিওরা ব্যাখ্যা করেন, অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কে বিদ্যমান সমস্ত কন্টেন্ট যেমন বাস্তবতা, যুক্তি, হিসাব, নৈতিক বিচার এবং ভাষায় রূপান্তরিত বিষয়গুলির সাথে একত্রিত হয়ে আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। অনুভূতিগুলি আমাদের মনের জন্য একটি “অনুভূত দৃষ্টিকোণ” তৈরি করে, যা সাধারণভাবে “স্বত্বা” বা ‘সেলফ’ (self) হিসেবে পরিচিত। তবে চেতনার বড় রহস্য আসলে এই “অভিজ্ঞতাকারী-স্বত্বা” বা সেলফের জীববৈজ্ঞানিক নির্মাণের পেছনে লুকানো।
তাহলে কীভাবে আমরা অনুভূতিকে জানতে পারি? এর উত্তরে দামের সোজাসাপ্টা জবাব হলো ‘ইন্টারোসেপশন’। ইন্টারোসেপশন হল সেই গোপন অনুভূতিসমূহ, যা আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এটি আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার অনুভূতি প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি অপরিস্ফুট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যখন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যন্ত্রণা বা ক্লান্তির অনুভূতি অনুভব করি, তখন আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি অবহিত হই, যেটা আমাদের জীবন রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করার পথে পরিচালিত করে।
এদিকে এক্সটারোসেপশন (অর্থাৎ দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, স্বাদ, এবং গন্ধ) সাধারণত আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় প্রাধান্য পায়, কারণ এগুলি বাইরের পৃথিবীকে আমাদের মনের মধ্যে উপস্থাপন করে। তবে ইন্টারোসেপশন অন্য ধরনের শক্তি, যা অনেক সময় আমাদের দৃষ্টির বাইরে থাকে এবং খুব সহজেই আমাদের চেতনাতে স্থান পায় না। ইন্টারোসেপশন জটিল না হলেও, এটি আমাদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান প্রদান করে। ইন্টারোসেপশনের কাজের জন্য দায়ী নার্ভসেলগুলো কিছুটা অপেক্ষমাণ হয়ে থাকে, যেমন ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিক কণিকা। তবে এই রাসায়নিক পদার্থের কাজ একেবারে দ্রুত গতির নয়, যেমন গুটামেট বা গাবার মতো নেট্রনগুলি কাজ করে। এই ধরনের প্রক্রিয়া যদিও ধীরগতিতে ঘটে, তবে এর ফলে যা ঘটে তা হলো শরীরের অভ্যন্তরের অনুভূতিগুলোর সাথে মস্তিষ্কের গভীর সংযোগ।
ইন্টারোসেপশনের সহজ ও সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কের সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি করে।শারীরিক অনুভূতিগুলির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে থাকা অনুভূতিগুলির মাধ্যমে আমরা আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বের অনুভূতি পাই-এটি আসলে জীবনের অনুভূতি।
অন্তর্নিহিত অনুভূতির মাধ্যমে আমরা জীবনযাত্রার গভীরতম অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সেই অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়। দামের মতে, অনুভূতির উপস্থিতি না থাকলে চেতনা অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, কারণ এটি জীবনের চলমান প্রক্রিয়ার উপলব্ধি ছাড়া চেতনা তৈরি করতে অক্ষম। জীবন যেভাবে চলছে, সেভাবে তার প্রতি যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব নয়।তাহলে অনুভূতি শুধুমাত্র শারীরিক অভ্যন্তরের অবস্থার এক ছবি নয়, বরং এটি আমাদের সত্ত্বার গঠন ও জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হই এবং আমাদের অস্তিত্বকে শাসন করতে পারি।অ্যান্টোনিও দামাসিও এবং হানা দামাসিওর এই নতুন তত্ত্ব আমাদের জন্য একটি বড় অনুধাবন। অনুভূতি শুধুমাত্র এক শারীরিক অভিজ্ঞতা নয়, আমাদের চেতনার মূল সত্তা। এটি আমাদের অস্তিত্বের অভ্যন্তরীণ পৃথিবী এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের গভীর সংযোগ স্থাপন করে।


