অবৈধভাবে ইউরোপ যেতে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর ঝুঁকি , তবু কেন বেপরোয়া বাংলাদেশি অভিবাসীরা

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবৈধ পথে ইতালি গেছেন। আর নৌকাডুবিসহ নানাভাবে মারা গেছেন ৭০০-এর বেশি মানুষ। আর ২০২৩ সালে সমুদ্রপথে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টার সময় নিখোঁজ বা মৃত্যুবরণ করেছেন ৩ হাজার ৭৬০ জন অভিবাসী। এর মধ্যে কয়েক শ বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হয়। বৈধ পথে যেসব অভিবাসনপ্রত্যাশী কাজের সন্ধানে ইতালি যেতে পারেন না তাঁদের একমাত্র ভরসা আন্তর্জাতিক আদম পাচারকারী ও তাদের সহযোগী দালাল। এসব পাচারকারীর সহায়তায় বিরাট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে (১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ পর্যন্ত) বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে বিদেশগামীদের নেওয়া হয় দুবাই। দুবাই থেকে তাঁদের পাঠানো হয় তুরস্ক কিংবা মিসর। দালালেরা সেখান থেকে পাঠিয়ে দেয় লিবিয়ায়, পরে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে যায় ইতালি।

লিবিয়ায় যাওয়ার পর দালালদের মাধ্যমে তাঁদের একটি দলে ঢোকানো হয়। পরে তাঁদের সাগরে কম্পাস (দিক নির্ণয়ের যন্ত্র) ধরে পথ চেনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরাই নৌকা চালাতে শুরু করেন। দালালেরা তখন সঙ্গে থাকেন না। ভূমধ্যসাগরে নৌকা ছাড়ার পর ভাগ্যাহত এসব অভিবাসীর দায়িত্বও কেউ নেয় না। লিবিয়া থেকে ইতালির দূরত্ব ১ হাজার ৭৭৮ কিলোমিটার। এই দূরত্বে যেতে পাচারকারী ও তাদের দালালেরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে নেয়। অনেক সময় বাতাস দিয়ে ফোলানো নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিলসমাধি হয় তাঁদের।

অভিবাসীদের সমুদ্রপথে গন্তব্য ইতালির সিসিলি দ্বীপ। কিন্তু কয়েক দিনের প্রশিক্ষণে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশিতে কম্পাস দিয়ে দিক নির্ণয় করতে না পারায় অনেকে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যান বা সলিলসমাধি হয়। অনেক সময় এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংশ্লিষ্ট কোস্টগার্ড সদস্যরা লিবিয়া কিংবা তিউনিসিয়া বন্দরে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে ঠিকানা হয় অন্ধকার কারাগার। সিসিলি পৌঁছাতে পৌঁছাতে পারলে ইতালীয় নৌবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর কারাগারে গিয়ে ‘পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম’ বা রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া হয়। সেটি অনুমোদন হলে অবৈধ অভিবাসীরা ইতালিতে থাকতে শুরু করেন। আর অনুমোদন না হলে তাঁদের ইতালি ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরত যেতে সপ্তাহখানেকের মতো সময় দেয় ইতালির পুলিশ।

বাংলাদেশিরা ইতালিতে গণহারে বেশ কয়েক বছর ধরে বেশি যাচ্ছেন। ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ কাগজপত্রসহ ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৫২ জন বাংলাদেশি সেখানে থাকছেন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে ইতালিতে অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি। ইতালিতে আয়রোজগার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ সহজ। এ ছাড়া অনেকেই ইতালি যাওয়ার পর সুযোগ বুঝে গ্রিস, স্পেন কিংবা ফ্রান্সে যান। বর্তমানে বৈধ প্রক্রিয়ায় ইতালিতে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ আছে। দেশটি চাইছে, ইতালিতে অবৈধভাবে থাকা ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত নতুন করে দেশটিতে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ থাকবে। তারপরও মানব পাচারকারী ও দালালেরা থেমে নেই।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে যাঁরা ইউরোপে যান, তাঁদের বড় একটা অংশ দেশে কোনো কাজ করেন না। তাঁদের আরেকটি অংশ যান গ্রাম থেকে, যাঁরা পারিবারিকভাবে কৃষিকাজে জড়িত। নির্মাণ খাত বিশেষ করে প্লাম্বার ও ইলেকট্রিশিয়ানরাও বিদেশে যান। আরেকটি অংশ যান যাঁরা দেশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মুদিদোকানসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতেন।মূলত উন্নত জীবনের আশায় এসব মানুষ ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হন। দেশের মধ্যে পর‍্যাপ্ত আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথটাই অনেকে বেছে নেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালিসহ ইউরোপের অনেক দেশে বৈধভাবে শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকে ঝুঁকি নিয়ে দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছেন। তাই ওই সব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বৈধভাবে শ্রমিক নেওয়ার সংখ্যা বাড়াতে সরকারকে জরুরিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতনতামূলক প্রচারের পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন